খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় বড় আঘাত হানবে এবং দেশের নাজুক অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই দাম বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে ৯ শতাংশে থাকা মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৫ শতাংশে উঠে যেতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের নীতিগত ভুল, অব্যবস্থাপনা ও আমদানিনির্ভরতার দায় সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপানো হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।
গত ২১ মে রাজধানীর কেআইবি মিলনায়তনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) দ্বিতীয় দিনের গণশুনানিতে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি (টিইসি) এই দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব উপস্থাপন করে।
কমিটি জানায়, প্রস্তাবিত দাম কার্যকর হলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত কমে আসতে পারে।
মূল্যস্ফীতি ১০.৫% ছাড়ানোর আশঙ্কা ড. জাহিদ হোসেনের
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২৫ পয়সা দাম বৃদ্ধির কারণে আগামী এক বছরে মূল্যস্ফীতিতে নতুন করে প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ যোগ হতে পারে। ফলে বর্তমানের ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘মূল্যস্ফীতিতে দ্বিমুখী আঘাত’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সরাসরি গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল যেমন বাড়বে (প্রত্যক্ষ প্রভাব), তেমনি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে তা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই বর্তাবে (পরোক্ষ প্রভাব)।
তবে ড. জাহিদ হোসেন সরকারের এই কঠিন সিদ্ধান্তের একটি বিকল্প দিকও তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সরকারের প্রচুর বকেয়া জমেছে, যার ফলে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো চলতি মূলধনের সংকটে ভুগছে। সরকার যদি স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী (আইপিপি) ইউনিটগুলোর বিল পরিশোধ করতে না পারে, তবে সরবরাহ ঝুঁকি ও লোডশেডিং বাড়বে, যা শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানিকে ব্যাহত করবে। সার্বিক বিবেচনায় এই মুহূর্তে সরকারের দাম বৃদ্ধি ছাড়া কোনো গতি ছিল না।
ভর্তুকি ও উৎপাদন খরচ কমাতে তিনি দীর্ঘমেয়াদি কিছু বিকল্পের সুপারিশ করেন। এগুলো হলো- বিতরণজনিত ক্ষতি ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ বা তার নিচে নামানো; উচ্চ মূল্যের হেভি ফুয়েল অয়েলভিত্তিক (এইচএফও) ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তি সংস্কার করা; কম উৎপাদন খরচের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে আগে বিদ্যুৎ কেনা।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক হওয়া উচিত: ড. ম তামিম
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিম বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়াটা আসলে সময়ের ব্যাপার ছিল। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছিল। এখানে অবশ্যই পলিসির (নীতিগত) ভুল রয়েছে।’
নিজস্ব জ্বালানি অনুসন্ধানে গুরুত্ব না দিয়ে আমদানির ওপর অতিরিক্ত (প্রায় ৬৫ শতাংশ) নির্ভরতা তৈরি করা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অব্যবস্থাপনাকেই তিনি বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
ড. তামিম উল্লেখ করেন, বিইআরসি হয়তো উৎপাদন খরচ হিসাব করে এই দাম নির্ধারণ করেছে, তবে ভর্তুকি তুলে দেওয়া বা দাম বাড়ানোর বিষয়টি সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এর পেছনে সরকারের জনপ্রিয়তা ও সামাজিক প্রভাব জড়িত থাকে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সামগ্রিক জনজীবন বিবেচনা করে সরকার হয়তো চূড়ান্ত পর্যায়ে বিইআরসির প্রস্তাবের চেয়ে কিছুটা কম দাম বাড়াতে পারে।
শিল্প খাত ও জনজীবনে এর প্রভাব নিয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের সামগ্রিক উৎপাদন এমনিতেই কমে গেছে। এই জোড়া সংকটের মধ্যে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা দেশের ভঙ্গুর ও নাজুক অর্থনীতির ওপর আরেকটি বড় নেতিবাচক ধাক্কা দেবে।
এটি একটি ‘ফায়ার ফাইটিং’ পরিস্থিতি: ড. মোস্তাফিজুর রহমান
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বিদ্যুৎ খাতকে আমদানিনির্ভরতা থেকে বের করে আনার তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘জ্বালানি হলো বাজার ব্যবস্থার গ্র্যান্ডফাদার। এর প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে, প্রভাব পড়বে আমদানিতেও।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারের রাজস্ব আদায়ে নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সরকার কতদিন ভর্তুকি দিয়ে যাবে? তার মতে, এখনকার প্রধান কাজ বা ‘ফায়ার ফাইটিং’ হলো কীভাবে দেশ জ্বালানি সাশ্রয় করবে। তিনি বলেন, দাম ১ টাকা ২৫ পয়সা নাকি ১ টাকা ১৫ পয়সা বাড়ানো হবে- তা নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। বিদ্যুতের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব সাধারণ ভোক্তার ওপরই গিয়ে পড়বে।
গণশুনানির মূল প্রস্তাব ও বর্তমান চিত্র
কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি টিইসির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৯৫ হাজার ৬১২ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিতরণ সংস্থাগুলোর প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার ২৮৫ কোটি টাকার নিট রাজস্ব প্রয়োজন হবে। বর্তমানে পিডিবির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ প্রায় ১২ টাকা ৫০ পয়সা, বিপরীতে তারা পাইকারি বিক্রি করে মাত্র ৭ টাকায়। ফলে প্রতি ইউনিটে সরকারকে প্রায় সাড়ে পাঁচ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরে আরও ২০ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে।