সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর তালিকায় নজর দিলে একটা বিষয় লক্ষ করা যায় তা হলো, প্রায় প্রতিটি দেশেরই সামরিক শক্তি অভাবনীয়। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে অথবা কথিত সেই দুঃস্বপ্নের মাঝে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, বিশ্ব মোড়লরা কিভাবে তাদের সামরিক শক্তির ঝুলি দিন দিন আরও ভারি করছে। তৃতীয় বিশ্বের প্রায় অদৃশ্য এক কোণে বসে বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের দিকে কিছুটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টি রাখার প্রচেষ্টাই ‘সামরিক শক্তির আদ্যোপান্ত’ সিরিজ। এই সিরিজে আজ থাকছে জাপানের সামরিক শক্তির বিস্তারিত-
জাপানের সামরিক বাহিনী দেশটির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরিবর্তিত জাপানের আদর্শগত অবস্থান, কূটনৈতিক রদবদল ও প্রতিরক্ষা খাতে নজর দেওয়ার মাধ্যমে দেশটির সামরিক খাত গঠিত হচ্ছে। এমনকি আধুনিক যুগে এসেও এই বাহিনীর বিবর্তন লক্ষণীয়। তবে দেশটির সামরিক শক্তির একটি স্পষ্ট ধারণা পেতে হলে জাপানের ইতিহাস থেকে শুরু করে অস্ত্রের বহরে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনের আদ্যোপান্ত নেড়ে দেখা জরুরি।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: যুদ্ধপরবর্তী শান্তিবাদ ও স্নায়ুযুদ্ধে জোটে প্রবেশ
১৯৪৭ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে মার্কিন পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর দেশটি নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। যুদ্ধ-পরবর্তী দেশটির সংবিধানে আগ্রাসীনীতি বর্জন করে শান্তিবাদী নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জাপানের সংবিধানের ৯নং অনুচ্ছেদটি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এই অনুচ্ছেদে যেকোনো পরিস্থিতিতে যুদ্ধ এড়ানোর বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। ফলস্বরূপ, জাপান ১৯৫৪ সালে দেশটি প্রতিরক্ষা-নির্ভর সামরিক বাহিনী গঠন করে। অর্থাৎ জাপানের সামরিক বাহিনী কারো সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে না। বহির্বিশ্বের আক্রমণ ঠেকানোর উদ্দেশেই এই বাহিনী গঠিত হয়েছে।
এদিকে ষাটে দশকে সংঘটিত স্নায়ুযুদ্ধের সময় দেশের নিরাপত্তার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করে জাপান সরকার।
১৯৫১ সালের ‘ইউএস-জাপান সিকিউরিটি ট্রিটি’ নামে চুক্তির মাধ্যমে নিরাপত্তার বিনিময়ে দেশে মার্কিন সেনা উপিস্থিতির অনুমতি দেয় টোকিও। এতে, পারমাণবিক আগ্রাসনে বিধ্বস্ত জাপান দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ পায়।

বর্তমান সক্ষমতা:
গত কয়েক দশকে আঞ্চলিক রাজনীতি কিছুটা উত্তাল থাকায় জাপান দেশের প্রতিরক্ষা খাতকে আরও জোরদার করার চেষ্টা করেছে। ২০২২ সালে ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি, ন্যাশনাল ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজি ও ডিফেন্স বিল্ড আপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে দেশটি প্রতিরক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। দেশের অস্ত্রের বহর উন্নত করার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাত আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বড় আকারের বাজেটও পাস করেছে টোকিও সরকার।
প্রতিরক্ষা জোরদারের লক্ষ্যে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বার্ষিক ৯৫ বিলয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান। এই সংখ্যা দেশটির বার্ষিক জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশই প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি জরিপের তথ্যমতে, এই অঞ্চলে ২০২৯ সালে মোট বার্ষিক প্রতিরক্ষা ব্যয় ৮০০বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামরিক খাতে চীনের বরাদ্দ বাড়ানোর সতর্কতাস্বরূপ দেশগুলো এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে-এটা সহজেই অনুমেয়।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ কিউশুতে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার রেঞ্জের শক্তিশালী দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে জাপান। চীন ও উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলায় দেশটির প্রশাসন এই পদক্ষেপ নিয়েছে। আগামী বছরেই এই শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত হয়ে পড়বে।
এ ছাড়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করছে জাপান।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে জাপান ও ভারতের মধ্যে অ্যাকুইসিশন অ্যান্ড ক্রস সার্ভিং অ্যাগ্রিমেন্ট (এসিএসএ) স্বাক্ষরিত হয়। এতে দুই দেশের সামরিক বাহিনী প্রয়োজন মোতাবেক নিজেদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে সাহায্য করতে পারবে।
২০২২ সালের মে মাসে ইউরোপ ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ‘স্বৈরাচারী সরকার’ মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
সে বছরের অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা তৎপরতা ও সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক একটি চুক্তির অধীনস্থ হয়েছে জাপান।

জাপানের পরমাণু নীতি
পারমাণবিক বোমার সরাসরি আগ্রাসনের শিকার একমাত্র দেশ পরমাণুবিজ্ঞানের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে তা অনুমেয়। জাপান আন্তর্জাতিক নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফেরাশন ট্রিটিতে স্বাক্ষরের পাশাপাশি দেশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে কঠোর নজরদারি বাস্তবায়ন করেছে।
তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জাপান ১৯৭৩ সাল থেকেই পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে আসছে।
এদিকে, ২০১১ সালে ফুকুশিমা দাইচিতে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর ২০১৩ সালে এক্ষেত্রে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে দেশটির প্রশাসন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
জাপানের প্রতিরক্ষা কৌশল আঞ্চলিক নিরাপত্তা শঙ্কার ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করে। বিশেষত, চীনের সামরিক খাতের বর্ধিতকরণ ও উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিয়ত কূটনৈতিক চাপের মুখে অস্ত্রের বহর শক্তিশালী করতে বাধ্য হচ্ছে দেশটি।
ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত রেখে মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সামরিক সমঝোতা বজায় রাখবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে আঞ্চলিক কূটনৈতিক জটিলতা মেটাতে জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমঝোতা আলোচনার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। কোরীয় উপদ্বীপের দেশগুলোর মধ্যে পারমাণবিক সহাবস্থানই এই আলোচনার মূল লক্ষ্য।
এ ছাড়া জাপানের প্রতিরক্ষায় মার্কিন প্রশাসনের ছত্রছায়া ভবিষ্যতেও বহাল থাকবে বলে ধারণা করাই যায়। তবে, সমসাময়িক জটিলতার কারণে নিয়মিত দুপক্ষের আলোচনা ও স্বচ্ছতা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এদিকে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের প্রতিরক্ষা বহর আধুনিকায়নে নজর দিয়েছে টোকিও প্রশাসন। এই পদক্ষেপের অধীনে অস্ত্রের বহরে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি সাইবার আক্রমণ ঠেকাতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে জাপানের সামরিক বাহিনী।
এ ছাড়া দেশের জনগোষ্ঠীতে বৃদ্ধের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান থাকায় দেশের নিরাপত্তা নতুন শঙ্কায় পড়েছে। দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক আকাঙ্ক্ষা পূরণের পাশাপাশি সামরিক খাতকে আরও শক্তিশালী করা জাপানের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং।
উদ্ভূত কূটনৈতিক জটিলতায় নিরীহ সামরিক অবস্থানের এই দেশ আদতেই নিরীহ থাকবে নাকি পরিস্থিতি বিবেচনায় আগ্রাসী নীতিগ্রহণ করবে তা অবশ্য সময়ই বলে দেবে।
সূত্র: দ্য নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ, ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশন, দ্য গার্ডিয়ান, এপি নিউজ, স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট।
নাইমুর/অমিয়/