সংখ্যাতত্ত্ব আবিষ্কারের আগেই মানুষ অঙ্ক জানত কি না তা নিয়ে এক ধরনের বিতর্ক রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে সংখ্যাতত্ত্ব আবিষ্কারের আগেই মানুষ অঙ্ক জানত। শুধু জানতই না, ওই অঙ্ক ব্যবহার করেই শিল্পচর্চা করত। এমনটাই বলছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি খ্রিষ্ট জন্মের প্রায় ছয় হাজার বছর আগের মেসোপটেমিয়া সভ্যতার একটি মাটির পাত্র পরীক্ষা করে এই ধারণা আরও জোরালো হয়েছে।
জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী ওই পাত্র নিয়ে গবেষণা করেন। তাদের গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ‘জার্নাল অব ওয়ার্ল্ড প্রিহিস্টরি’তে। বিজ্ঞানীরা জানান, এটি ছিল হালাফিয়ান সভ্যতার নিদর্শন। উত্তর মেসোপটেমিয়ায় খ্রিষ্ট জন্মের আনুমানিক ৬ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ বছর আগে এই সভ্যতার বিকাশ ঘটে।
গবেষকদের নজর কাড়ে পাত্রটির গায়ে আঁকা ফুলের নকশা। সংখ্যা খুব কম নয়। প্রায় ৭০০টি ফুল আঁকা হয়েছিল সেখানে। গবেষক ইয়োসেফ গারফিঙ্কেল এবং সারা ক্রুলউইচ লক্ষ্য করেন, ফুলগুলোর পাপড়ি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক বিন্যাসে সাজানো। বিন্যাসের ক্রম ছিল ৪, ৮, ১৬, ৩২ ও ৬৪।
বিজ্ঞানীদের দাবি, অঙ্ক কষার এত পুরোনো প্রামাণ্য দলিল আগে পাওয়া যায়নি। এই মাটির পাত্রই সেই প্রমাণ। গবেষকদের যুক্তি, সংখ্যার আনুষ্ঠানিক আবিষ্কারের আগেই অ্যালগরিদমের ব্যবহার ছিল। আর তার স্পষ্ট নিদর্শন এই শিল্পকর্ম।
ঐতিহাসিকদের মতে, সংখ্যাতত্ত্ব এক দিনে আবিষ্কৃত হয়নি। অনেকেই মনে করেন, এক জায়গাতেও নয়। সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, ১ থেকে ৯ পর্যন্ত সংখ্যার ধারণা প্রথম গড়ে ওঠে মেসোপটেমিয়াতেই। সময়কাল ছিল আজ থেকে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার বছর আগে। কিন্তু হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সংখ্যাগুলোর আনুষ্ঠানিক ধারণারও আগে অঙ্কের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। আর সেটিও হয়েছিল মেসোপটেমিয়ায়। তাদের বক্তব্য, পাত্রের গায়ে ফুল আঁকার ধরন দেখলেই বোঝা যায়, জ্যামিতির মাপজোক না জেনে এমন কাজ করা সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট ছকে জায়গা ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি অংশে নকশা বসানো হয়েছে পরিকল্পনা অনুযায়ী।
এর আগে প্রাচীন কালের যেসব পাত্র ইতিহাসবিদেরা উদ্ধার করেছেন, সেগুলোর গায়ে সাধারণত পশু বা মানুষের ছবি আঁকা থাকত। ফুলের ছবি খুব একটা পাওয়া যায়নি। হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সেই সময় মানুষ ফুল ও পাতার ব্যবহার জানত। দৈনন্দিন নানা কাজে তা ব্যবহারও করত। কিন্তু শিল্পকর্মে ফুলের ছবি আঁকার নজির ছিল বিরল।
এদিক থেকে মেসোপটেমিয়ার ওই মাটির পাত্রটি ব্যতিক্রম। বিজ্ঞানী সারা ক্রুলউইচ বলেন, ‘এই পাত্র দেখলে বোঝা যায়, আধুনিক মানুষ লিখতে শেখার আগেই অঙ্ক কষতে শিখেছিল।’ তার মতে, শিল্পকর্মের মধ্য দিয়েই ভাগ ও অ্যালগরিদমের প্রয়োগ আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গবেষক ইয়োসেফ গারফিঙ্কেলের মতে, ‘পাত্রের পুরো জায়গাকে নির্দিষ্ট মাপে ভাগ করার কাজটি অঙ্কের জ্ঞান ছাড়া সম্ভব নয়।’ তিনি মনে করেন, হালাফিয়ান সভ্যতার মানুষজন এই অঙ্কের জ্ঞান শুধু শিল্পেই নয়, দৈনন্দিন জীবনেও ব্যবহার করত। জার্নাল অব ওয়ার্ল্ড প্রিহিস্টরি।