পৃথিবীর মানচিত্রে আলাস্কা এক শীতল ও দূরবর্তী ভূখণ্ড। বরফাচ্ছন্ন এই অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি ও ভাষা আধুনিক সভ্যতার প্রবল স্রোতে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেছে। সেই হারিয়ে যাওয়া ভাষাগুলোর একটি ছিল ইয়াক (Eyak)। আলাস্কার আদিবাসী ইয়াক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষা। আজ সেই ভাষার আর কথ্যরূপ নেই। তবে একটি অভিধানের পাতায়, কিছু শব্দের স্মৃতিতে এবং একজন নারীর অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে ইয়াক ভাষা এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি।
এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মেরি স্মিথ জোন্স। যিনি একজন সাধারণ আদিবাসী নারী, যিনি ছিলেন ইয়াক ভাষার শেষ মাতৃভাষী বক্তা।
ভাষাবিদদের মতে, ইয়াক ভাষাটি Na-Dené ভাষা পরিবারভুক্ত, যা উত্তর আমেরিকার প্রাচীন ভাষাগোষ্ঠীর একটি। এক সময় আলাস্কার দক্ষিণাঞ্চলে ইয়াক জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবন, আচার-অনুষ্ঠান, গান ও গল্পে এই একটি ভাষার স্বাভাবিক ব্যবহার ছিল। কিন্তু উনিশ ও বিশ শতকে ঔপনিবেশিক শাসন, ইংরাজি ভাষার আধিপত্য, স্কুলে মাতৃভাষা চর্চার নিষেধাজ্ঞা এবং আধুনিক জীবনের চাপ- ইয়াক ভাষাকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে ঠেলে দেয়। নতুন প্রজন্ম আর ইয়াক ভাষা শেখেনি। একে একে ভাষাভাষীরা পরলোকগমন করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল যে, একটি সম্পূর্ণ ভাষা টিকে আছে মাত্র একজন মানুষের স্মৃতিতে।
১৯১৮ সালে জন্ম নেওয়া মেরি স্মিথ জোন্স ছিলেন সেই মানুষটি। ইয়াক ভাষা ছিল তার শৈশব-কৈশোরের ভাষা, তার ঘরের ভাষা, তার মায়ের ভাষা। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন তিনি ছাড়া আর কেউ এই ভাষায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে পারেন না। এই উপলব্ধি তাকে বিষণ্ন করে তোলে। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং বয়স যখন ৮২, তখন তিনি একটি অসম্ভব সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ইয়াক ভাষাকে লিখিত আকারে সংরক্ষণ করবেন।
যে বয়সে মানুষ সাধারণত বিশ্রাম নেয়, সেই বয়সে মেরি স্মিথ জোন্স শেখেন কম্পিউটার। উদ্দেশ্য একটাই, তা হলো নিজের মাতৃভাষাকে বাঁচানো। প্রযুক্তির সঙ্গে তার পূর্বপরিচয় ছিল না, কিন্তু ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে শেখার শক্তি জুগিয়েছিল।
ভাষাবিদ মাইকেল ক্রাউস (Michael Krauss)-এর সহায়তায় তিনি শুরু করেন এক দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য কাজ; Eyak Dictionary তৈরির কাজ।
প্রায় ৭ বছর ধরে তিনি শব্দ মনে করেন, উচ্চারণ ঠিক করেন, অর্থ ব্যাখ্যা করেন। কখনো স্মৃতির গভীর থেকে তুলে আনেন শৈশবের শব্দ, কখনো পুরোনো গল্পের ভাঙা অংশ জোড়া লাগান। প্রতিটি শব্দ যেন ছিল সময়ের বিরুদ্ধে এক একটি লড়াই।
তার তৈরি করা ইয়াক ভাষার এই অভিধান শুধু শব্দের তালিকা নয়। এটি একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, জীবনবোধ ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি। যে ভাষা আর কোনো শিশুর মুখে শোনা যায় না, সেই ভাষা এই অভিধানের পাতায় জীবিত হয়ে ওঠে। ইয়াক ভাষা আজ আর কথ্য নয়, কিন্তু পুরোপুরি হারিয়েও যায়নি এই অভিধানটির কারণেই।
২০০৮ সালে মেরি স্মিথ জোন্স মারা যান। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ইয়াক ভাষা হারায় তার শেষ মাতৃভাষী বক্তাকে। ভাষাবিদদের ভাষায়, সেই দিন ইয়াক ভাষা ‘extinct as a spoken language’ হয়ে যায়।
তবে ভাষা কি কেবল তখনই বেঁচে থাকে, যখন তা উচ্চারিত হয়?
মেরি স্মিথ জোন্সের জীবন এই প্রশ্নের এক অনন্য উত্তর দেয়।
আজ ইয়াক ভাষায় কেউ কথা বলে না। কিন্তু ভাষাবিদরা অভিধানটি ব্যবহার করে ভাষাটি গবেষণা করছেন, শিক্ষার্থীরা পড়ছে, কেউ কেউ নতুন করে শেখার চেষ্টা করছেন। ইয়াক ভাষা হয়তো নীরব, কিন্তু একেবারে নিঃশেষ নয়।
ভাষাবিদদের মতে, বিশ্বে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। ইয়াক ভাষার গল্প তাই শুধু আলাস্কার নয়, এটি সারা পৃথিবীর ভাষা ও সংস্কৃতির গল্প।
মেরি স্মিথ জোন্স আমাদের শেখান, একটি ভাষা বাঁচাতে রাষ্ট্র বা প্রযুক্তির চেয়েও বেশি প্রয়োজন একজন মানুষের দায়বদ্ধতা। বাংলাদেশের মতো বহুভাষিক দেশেও এই গল্প গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের রয়েছে আদিবাসী ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা, লোকভাষা ইত্যাদি। সব ক’টিই যদি অবহেলায় পড়ে থাকে, তবে একদিন হয়তো সেগুলোর শেষ বক্তাও কোনো নিঃশব্দ বিদায় নেবে।
বরফে ঢাকা আলাস্কা থেকে উঠে আসা এক বৃদ্ধ নারীর এই গল্প প্রমাণ করে ভাষা শুধু শব্দ নয়, এটি স্মৃতি। আর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কখনো কখনো একজন মানুষই যথেষ্ট। মেরি স্মিথ জোন্স ছিলেন ইয়াক ভাষার শেষ আলো। সেই আলো নিভে গেলেও, তার রেখে যাওয়া আলোছায়া আজও আমাদের ভাষা সংরক্ষণের পথ দেখায়।
তারেক/
.jpg)
.jpg)