সন্জীদা খাতুন বাংলার গৌরব। আজীবনের সাধনা দিয়ে তিনি তা অর্জন করেছেন। এই ছায়ানট গড়তে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে তিল তিল করে শ্রম দিয়েছেন। নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। তিনি নিজের দিকে তাকাননি। পরিবারের দিকে তাকাননি। নিজে ঢুকে গেছেন ছায়ানটে। আজ ছায়ানট কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি প্রতীক, একটি প্রয়াস, একটি জীবনদর্শন। তার সঙ্গে শিল্প আর সংস্কৃতির মিশ্রণ।
সমাজ জীবনে কত দীর্ঘ পথ তিনি অতিক্রম করেছেন। আর এ অভিযাত্রায় নিজেকে ক্রমে ক্রমে আরও বিকশিত করে তুলেছেন, আরও প্রসারিত করেছেন। আরও গভীরে প্রবেশ করেছেন। তার সংগীত প্রশিক্ষণ ছিল একটি বড় ক্ষেত্র। পাশাপাশি সংগীতের ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, সংগীতের মধ্যে জীবনের যে প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে তার বিশদীকরণ- এই সবকিছুর ক্ষেত্রে সমগ্র বাংলা সংস্কৃতিতে তিনি একজন প্রধান ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু নিজেকে তিনি সর্বত্র গুটিয়ে চলেছেন। আত্ম-অহমিকা বলে তার ভেতর কোনোদিন কিছু ছিল না। তিনি শুধু চেয়েছেন অপরের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে। সে লক্ষ্য নিয়ে তিনি কত রকম কাজে যে যুক্ত হয়েছিলেন। ছায়ানট ঘিরে তার কত রকম কর্মকাণ্ড ছিল। জাতির যেকোনো দুর্যোগে ছায়ানট যেন ঝাঁপ দিতে পারে- সে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হোক, বন্যা-ঝড়-ঝঞ্ঝা হোক বা মানুষের সৃষ্ট দুর্যোগ হোক, সেই চেষ্টা করে গেছেন। যে দুর্যোগ সমাজকে বিভক্ত করে, যে দুর্যোগ সাম্প্রদায়িকতার বিষে সমাজ-দেহকে জর্জরিত করতে চায়, সেই বিষ-বিদ্বেষ অন্তর থেকে দূর করার জন্য নানা রকম সাধনা করেছেন। ব্রতচারী চর্চার কথা যদি বলি, আবৃত্তি চর্চার কথা যদি বলি বা আরও নানা দিক সেসব মিলে তার যে সমগ্রতা সেটা বহুভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ছায়ানট তো একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। কিন্তু এর অন্তরাত্মা ছিলেন সন্জীদা খাতুন। আর এ অন্তরাত্মার যে শক্তি সেটা তিনি প্রতিনিয়ত নানাভাবে প্রকাশ করে গেছেন, বহু মানুষের অন্তর ছুঁয়ে গেছেন। বহু শিক্ষার্থীর মনে মানবতার দীক্ষা, অসাম্প্রদায়িকতার দীক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সংকটে-দুর্যোগে কীভাবে স্থিতধি থেকে কীভাবে পথ চলতে হয়, সেই প্রেরণা তিনি সঞ্চার করে গেছেন।
আজকে এই ভবনে তিনি আবার এসেছেন। ‘সম্মুখে শান্তি পারাবার’- তার তরণী তিনি ভাসিয়ে দিচ্ছেন, আমাদের কর্ণধার। এই ভবনে যখন তার পদপাঠ ঘটে, তখন তার পেছনে দেখি দীর্ঘ ইতিহাস। সেই ষাটের দশকে বাংলা একাডেমির একটা ছোট কক্ষে ছায়ানটের যাত্রা শুরু, তারপর ইংলিশ প্রিপারেটরি স্কুলে ছনে ছাওয়া বেতের ঘর, তারপর নানা জায়গা থেকে বিতাড়িত হতে হতে ছায়ানট স্বাধীনতার পর ঠাঁই পেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে। আর সেখান থেকে ছায়ানট চলে এল তার স্থায়ী ভবনে। এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় তিনি যাদের কাছে সংগীতের বাণী পৌঁছে দিয়েছেন, সুর পৌঁছে দিয়েছেন, শিল্পের স্পর্শে যাদের জাগ্রত করেছেন, তারা সবাই মিলে ছায়ানট। তারা যেভাবে নিজেদের ছড়িয়ে দিয়েছেন দেশের নানা প্রান্তে, দেশের বাইরে সেটাই ছায়ানট। তার বাইরে আরও বড় পরিসরে যে কাজ জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদকে ঘিরে তিনি দেশব্যাপী ঘুরেছেন, চারণের মতো ঘুরেছেন। যেখানে যেটুকু সুযোগ হয়েছে ছেলেমেয়েদের একত্র করে গানের পাঠ দিয়েছেন। এই পাঠ আসলে জীবনের পাঠ। এই তার অবদান, এই তার ভূমিকা, এই তার হাতের স্পর্শ, এই তার কণ্ঠের জাদুস্পর্শ। এই জাদুকাঠির ছোঁয়ায় বাঙালি জাতি জেগে উঠেছিল। এই জাগরণ ষাটের দশক থেকে ক্রমে ক্রমে পহেলা বৈশাখের আয়োজন। এই ছোট্ট আয়োজন যে বিশাল জাতীয় উদ্যোগে রূপ নিল তার পেছনে ছিলেন সন্জীদা খাতুন। সমস্ত কাজের পেছনে সন্জীদা খাতুন। প্রকাশ্যে তিনি যত না, তার চেয়ে প্রচ্ছনে আগুন জ্বালানোর কাজ করেছেন। এক আগুন থেকে লক্ষ অগ্নিশিখা জ্বালিয়েছেন। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা গড়ে; যারা শিক্ষার্থী-শিল্পী তাদের সঙ্গে লোকসংগীতশিল্পীদের সমন্বয় ঘটিয়ে এক অসাধারণ সাংগীতিক প্রতিবাদের ইতিহাস তিনি রচনা করেছিলেন। আর তারপর বাংলাদেশের যে অভিযাত্রা, সেখানে তিনি চেয়েছিলেন আমরা যেন আরও গভীরে যেতে পারি। আরও যেন ব্যাপ্তি আমরা অর্জন করতে পারি। সে জন্য তিনি নানা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ছায়ানটের সঙ্গে সমাজের, সংস্কৃতির অসাধারণ মেলবন্ধন তৈরি করেছেন।
বহু মানুষের অন্তরে তিনি জেগে আছেন। তিনি জেগে থাকবেন দেশের নানা প্রান্তে। যখন নানাভাবে আবারও সেই পুরোনো সাম্প্রদায়িকতা, পুরোনো ঘৃণা-বিদ্বেষ সমাজদেহে নানা বিকৃতি তৈরির প্রয়াস চলছিল, তখন শিল্প ও সংস্কৃতির জোরে জীবন উপলব্ধির শক্তিতে সন্জীদা খাতুন দাঁড়িয়েছিলেন, আমাদের তরণীর কান্ডারি হয়ে উঠেছিলেন। তার সেই ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। তিনি থাকবেন না। তার কর্মের সুফলগুলো রয়ে গেছে। তার কর্ম যাদের উজ্জ্বীবিত করেছে, সেই মানুষগুলো রয়ে গেছে। এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে তার জীবন, তার কর্ম, তার সাধনা, তার এই ঐকান্তিক শ্রম, প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে তার যে বিনিময় এই সবকিছু মিলিয়েই তার বিশাল ব্যক্তিত্ব। বিগত দশকজুড়ে তিনি নজরুল চর্চায় পরিপূর্ণভাবে নিবেদন করেছিলেন। বাঙালির যে সম্পদ তিনি নিজে আহরণ করেছিলেন, সেই সম্পদ তিনি ক্রমেই প্রসারিত করতে কাজ করে গেছেন। এই কাজ আমাদের জন্য উদাহরণ। এ কাজের মধ্য দিয়ে আমরা সন্জীদা খাতুনকে বারবার ফিরে পাব।
গবেষক-প্রাবন্ধিক, সহসভাপতি, ছায়ানট
লাইসা আহমদ লিসা
সাধারণ সম্পাদক, ছায়ানট
অনেকে সন্জীদা খাতুনকে খুব কঠিন মানুষ মনে করে। অথচ তাকে খুশি করা কিন্তু কঠিন কিছু ছিল না। তার বাইরের দিকটা ডিমের খোলসের মতো, আর ভেতরটা ছিল নরম তুলতুলে। আমি পুত্রবধূ হিসেবে বলব, শাশুড়ির পরিবর্তে তার কাছ থেকে মায়ের ভালোবাসাটাই পেয়েছি। ভেতর ভেতরে প্রচণ্ড স্নেহপ্রবণ মন ছিল তার। ভালো লাগা, মন্দ লাগার ব্যাপারগুলো তিনি স্পষ্ট করে বলে দিতে পারতেন। মনে যা এসেছে, তা তিনি সহজে বলে দিয়েছেন। ন্যায্য কথা তিনি সোজাসাপ্টা বলে দিতেন। তার দৃঢ়তার পরিচয় আমি বহুবার পেয়েছি। কে কোথাকার লোক, তাদের ইতিহাস কী তা নিয়ে জানতেন তিনি। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মানুষ সম্পর্কে বলতে পারতেন তিনি।
আমরা যখন কোনো সংকটে পড়েছি, তার দিকনির্দেশনা পেয়েছি। তাকে জিজ্ঞেস করলেই হতো। আমরা কোন পথে চলব, তার নির্দেশনা দিতেন তিনি। আপসহীন এই মানুষটি বাঙালির স্বাধিকার আদায়ে ছিলেন দৃঢ়চেতা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমরা তার সেই সংগ্রামী রূপটি দেখেছি। ব্যক্তিজীবনের সুখের দিকে না তাকিয়ে সমাজের জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে গেছেন। মানুষ গড়তে চেয়েছিলেন তিনি। আজীবন সে কাজেই তার দায়বদ্ধতা ছিল। তার সেই দেশপ্রেম জেগে থাকবে আমাদের মনে।