১০ মে, রবিবার, আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবস। দক্ষিণ কলকাতার ‘ভানুশ্রী’ বাড়িতে এই বিশেষ দিনে কথা বলার সৌভাগ্য হলো বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে।
মাতৃ দিবসে মাকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এমন কিছু কথা তিনি আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন যা নজরুলপ্রেমীদের কাছে অমূল্য সম্পদ। নজরুল-সঙ্গীতের বিস্মৃতপ্রায় শিল্পীর নজরুলচর্চা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ যেমন হলো, ঠিক তেমনই চাক্ষুষ করলাম কিছু দুর্লভ ছবি।
ছবিগুলির বিশদ বিবরণ লেখার সঙ্গেই রইল। শোনালেন নজরুলের প্রতি পিতৃদেবের শ্রদ্ধা ও আবেগের কথাও।
১৯২৯ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার ভবানীপুরে কাঁসারিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। পিতা পরেশ চন্দ্র মুখার্জী, মাতা শিশুবালা দেবী। ওই অঞ্চলে বাস করতেন বহু বিশিষ্টজন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী অমলাশঙ্করের পরিবার।
অমলাশঙ্করের পিতা অক্ষয় নন্দীর ঐকান্তিক আগ্রহে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিশিষ্ট নজরুল-সঙ্গীত শিল্পী সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের কাছে নীলিমা সঙ্গীতের তালিম নেওয়া শুরু করেন।

সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় ও রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায়- বাংলা সঙ্গীত জগতের দুই স্বনামধন্য শিল্পীর কাছেই তিনি তালিম নেন। সব ধরনের বাংলা গানেই নীলিমা ছিলেন পারদর্শী। বিশেষ করে কীর্তন তাঁর কণ্ঠে অন্য মাত্রা পেয়েছিল।
আকাশবাণীতে গান গাওয়া শুরু করেন ১৯৪৪ সালে, যা ২০১১ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তাঁর কণ্ঠে গীত কীর্তনের রেকর্ডও প্রকাশিত হয়। সঙ্গীতের শিক্ষক সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতেই পরিচিত হন বিখ্যাত অভিনেতা, কৌতুক সম্রাট ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তারপর বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন।

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সুর সেভাবে না থাকায় সঙ্গীত পরিবেশনে তিনি কখনও আগ্রহী হননি ঠিকই কিন্তু সঙ্গীতের প্রতি তাঁর অনুরাগ নীলিমাকে অনেক দূর এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেগ, ভালোবাসা স্মরণ করলেন তাঁর পুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়।
পিতার প্রয়াণের এত বছর পরও সেই স্মৃতি উজ্জ্বল হয়েই আছে। নজরুলের একাধিক কবিতা কণ্ঠস্থ ছিল তাঁর। মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ সত্তাকে তিনি অন্তরে ধারণ করতেন। ঢাকা বেতারে নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করেছেন।
তাঁর কণ্ঠে ‘বিদ্রোহী’, ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ শুনে মুগ্ধ হতেন নজরুলপ্রেমীরা। কলকাতায় ঘরোয়া আসরে প্রায়ই তাঁর কণ্ঠে নজরুলের কবিতা শোনার সৌভাগ্য হতো শ্রোতাদের। এরকম পরিবেশে নীলিমাও হয়ে উঠেছিলেন নজরুল অনুরাগী। তাঁর কণ্ঠে ‘দূরের বন্ধু আছে আমার’, ‘হে মাধব, হে মাধব’, ‘বল রে জবা বল’, ‘তিমির-বিদারী অলখ-বিহারী’ এখনও পুত্রের কানে বাজে।
অসুস্থ নজরুলের জন্মদিনে একাধিবার সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কবির বাড়িতে উপস্থিত থেকেছেন নীলিমা, কবিকে শুনিয়েছেন তাঁরই গান। এ এক পরম সৌভাগ্য।
গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানতে পারি, একাধিক নজরুল-সঙ্গীত নীলিমা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে গাইতেন ঠিকই কিন্তু সেই সময় নজরুলকে নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার অভাবে অনেক সময় সঠিকভাবে জানা যেত না গীতিকার ও সুরকারের নাম।
কবির জন্মদিনের একটি বিশেষ ছবি সযত্নে রেখে দিয়েছেন গৌতম। নজরুল তখন অসুস্থ। তাঁর জন্মদিনে বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পীরা কবির বাড়িতে গিয়ে তাঁরই গান গেয়ে প্রাণের কবির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতেন। নজরুলের ৬৮তম জন্মদিবসে অভিনেত্রী সঙ্ঘের পক্ষ থেকে শিল্পীরা কবির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে যান। অনুপ কুমার, রবি ঘোষ-সহ নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ওইদিন উপস্থিত ছিলেন।
ছবিতে দেখা যায় নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় হারমোনিয়াম সহযোগে সঙ্গীত পরিবেশন করছেন, পাশে মনযোগ সহকারে শুনছেন কল্যাণী কাজী (কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ), অভিনয় জগতের কিংবদন্তী শিল্পী অনুপ কুমার, রবি ঘোষ-সহ স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম।
এই ছবি আমাদের আবেগ বিহ্বল করে তোলে। নির্বাক কবির সঙ্গে শিল্পীদের এই আন্তরিক সংযোগ আমাদের ভাবায়।
পরবর্তী সময়ে নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে রবীন্দ্র সদন, নজরুল মঞ্চে আয়োজিত একাধিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন নীলিমা।
১৯৮৩ সালে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণের কয়েকদিন আগে নীলিমার বাড়িতে উপস্থিত হন বিদূষী হৈমন্তী শুক্লা। কানন দেবীর কণ্ঠে জনপ্রিয় নজরুল-সঙ্গীত ‘আকাশে হেলান দিয়ে’ শেখার জন্যই তাঁর আগমন। নীলিমার সুরেলা কণ্ঠে সেই গান শুনে পরবর্তীতে আত্মস্থ করেন হৈমন্তী।
এভাবেই নজরুল-সঙ্গীতকে ভালোবেসে পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে তুলে দিয়েছেন তিনি।

১৯৬০ সালে নিজের বাড়িতে তৈরি করেন সঙ্গীত বিদ্যালয় ‘সঙ্গীতশ্রী’। শ্যামল মিত্র, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ অনেকেই এই বিদ্যালয়ে সঙ্গীত শিক্ষা দিতেন।
নীলিমার পছন্দের নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। প্রতিবছর সরস্বতী পুজোতে ভানু-নীলিমার বাড়িতে বসতো সঙ্গীতের আসর। শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, ফিরোজা বেগম-সহ বহু গুণী শিল্পী এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন।
ভানু ও নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। নজরুলকে ভালোবেসে ১৯৯৬ সালে তিনি একটি তথ্যচিত্র প্রযোজনা করেন। তরুণ প্রজন্মের সামনে নজরুল-প্রতিভাকে সঠিকভাবে তুলে ধরার জন্যই তাঁর এই প্রয়াস।
২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে, সঙ্গীত পিপাসুদের চোখের জলে ভাসিয়ে বিদায় নেন নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গীত জগতে এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। নীলিমার কণ্ঠে গীত গানগুলিকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা তরুণ প্রজন্মের অবশ্য কর্তব্য।
অমিয়/