মাত্র ২৩ বছর বয়সে জন্মভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেলেও পুরোটা জীবন বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা হৃদয়ে ধারণ করে গেছেন কিংবদন্তি পরিচালক ঋত্বিক ঘটক। দেশ ভাগ হলেও আপন শিকড় বাংলাদেশ থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। তার নাটক, চলচ্চিত্রের নানা অধ্যায়ে উঠে এসেছে দেশভাগের কথা। তার যমজ বোন প্রতীতি দেবীও সেই অভিঘাত মনে ধারণ করেছেন। আমৃত্যু অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বিশ্বাসের স্ফূরণ ঘটিয়েছেন নানা কর্মকাণ্ডে।
আগামীকাল মঙ্গলবার কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক এবং তার যমজ বোন প্রতীতি দেবীর জন্মশতবার্ষিকী। এ উপলক্ষে রবিবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে ছায়ানট ভবনে ‘জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা, যার পুরোভাগে ছিলেন প্রতীতি দেবীর কন্যা অধিকারকর্মী আরমা দত্ত।
এই অনুষ্ঠানে এসে চলচ্চিত্র প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান, অভিনেতা আবুল হায়াত, চলচ্চিত্র পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল, নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, প্রাবন্ধিক-গবেষক মফিদুল হক, অধিকারকর্মী সুলতানা কামাল তাদের স্মৃতিচারণে ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রে দেশভাগের অভিঘাত তুলে ধরেন। এ ছাড়া ঋত্বিক ঘটক পরিবারের ঘনিষ্ঠজন ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব কিশোয়ার কামাল ও মাহেরা খাতুন, চলচ্চিত্র নির্মাতা শামীম আখতার অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণা করেন। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অধিকারকর্মী খুশী কবির।
অধিকারকর্মী আরমা দত্তের স্মৃতিচারণায় ঋত্বিকের দেশভাগের কথা উঠে আসে। সাতচল্লিশে দেশভাগের পরের বছর; রাজশাহীর ভিটেমাটি ছেড়ে কলকাতায় চলে যেতে হয় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুরেশ চন্দ্র দত্তকে। পদ্মা নদীবিধৌত রাজশাহীর স্মৃতি নিয়ে পরদেশে চলে যান ২৩ বছরের যুবক ঋত্বিক ঘটক এবং তার যমজ বোন প্রতীতি দেবী। এর কয়েক বছর পর ঋত্বিক মঞ্চনাটকে এবং চলচ্চিত্রে সেই দেশভাগের যন্ত্রণাক্লিষ্ট অধ্যায়ের গল্প বলতে শুরু করেন।
১৯৬২ সালে ‘সুবর্ণরেখা’ চলচ্চিত্র নির্মাণের পর ঋত্বিক ঘটকের জীবনে ঘটে যায় বড় পরিবর্তন। দেশভাগ তার মনে গভীর রেখাপাত করে। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে ঋত্বিক ঘটকের বোন প্রতীতি দেবীর শ্বশুর ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং দেবর দিলীপ কুমার দত্তকে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। বোনের এই বিয়োগব্যথা ঋত্বিক ঘটকের মনেও বিষাদের ছায়া ফেলে। এই বিয়োগব্যথা নিয়েই বাহাত্তর সালে তিনি যখন বাংলাদেশে আসেন, প্রথমেই ছুটে যান কুমিল্লায়। কুমিল্লার ধর্মসাগর এলাকায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি। সেই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ঋত্বিক ঘটক বিলাপ করেছিলেন, ‘এই মানুষটাকেও মেরে ফেলতে হলো!’ ঋত্বিক ঘটক ছুটে গিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিতাস নদীর পাড়ে, যেখানে জন্মেছিলেন বাঙালির ভাষা আন্দোলন ও স্বাধিকার আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
মা প্রতীতি দেবী ও মামা ঋত্বিকের দেশপ্রেমের কথা বলতে গিয়ে আরমা দত্ত বলেন, ‘তারা দেশ ভাগ হলেও শিকড়ের জায়গা থেকে কখনো এক ইঞ্চি পেছনে সরে যাননি।’
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্রের শুটিং করতে ঋত্বিক ঘটক যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণ ঘাটে পৌঁছালেন, তখন তিনি সেই নদীর পানি চোখে-মুখে ছিটিয়ে নিয়ে অভিভূত হয়ে পড়েন। বাহাত্তর সালের জুলাই মাসের সেই বিকেলের কথা স্মরণ করলেন এই চলচ্চিত্রের প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘ঋত্বিকদা আমাকে বললেন, আমি দেশ ছেড়ে চলে গেছিলাম। এখন তিতাসের জল ছিটিয়ে এই মাটি আর জলের অনুভব নিচ্ছি। দেশের প্রতি ছিল তার অপরিসীম দরদ।’
মফিদুল হক বলেন, ‘তিতাস বাংলাদেশের এক শীর্ণকায় নদী। এই নদী আবার বর্ষায় জেগে ওঠে। নদী যেন বাংলাদেশের প্রতীক। ঋত্বিকের সঙ্গে কোথায় যেন নদীর এক অনন্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ যদিও মালোপাড়ার গল্প; তবু এই চলচ্চিত্রে ঋত্বিক বলতে চেয়েছেন এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ঘুরে দাঁড়ানোর কথা; যেন তিতাসের মতোই দেশ জেগে উঠবে নব-উদ্যমে।’
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আবুল হায়াত চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। কিংবদন্তি অভিনেতা সৈয়দ হাসান ইমাম তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটকের কাছে। চলচ্চিত্রের ‘জমিদার’ চরিত্রে অভিনয়ের নানা ঘটনার স্মৃতিচারণা করেন আবুল হায়াত, ‘এই সিনেমাটি আমার জীবনের প্রথম সিনেমা। আর এ সিনেমাটি এখন চলচ্চিত্রবিষয়ক পড়াশোনায় টেক্সট বুক (পাঠ্য) হয়ে গেছে। আমার জন্য এটা এক বড় আশীর্বাদ।’
রামেন্দু মজুমদার বলেন, কলকাতায় বহুরূপী নাট্য সংঘের হয়ে ঋত্বিক ঘটক ১৯৫৪ সালে ‘সাঁকো’ নামে একটি নাটক মঞ্চায়ন করেন। কলকাতা ও বাংলাদেশের একটি অঞ্চলের দাঙ্গার প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি এই নাটকটি রচনা করেছিলেন। তার নাটকে সামাজিক ব্যবস্থা, দেশভাগ আর নারীর অবস্থান উঠে এসেছে বারবার।
সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমি যতবার ঋত্বিক ঘটকের কথা ভাবি, ততবার আমার জীবনানন্দ দাশের ‘বোধ’ কবিতার কথা মনে পড়ে। মানুষের প্রাণের যে আহ্লাদ, তাই তিনি জাগিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। প্রতীতি দেবীকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। তিনি আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু ছিলেন। মাঝেমধ্যে দেখতাম এক সুবেশী, পরিমার্জিত নারী আমাদের বাড়িতে আসছেন। কী দারুণ গান গাইতেন। তার মধ্যে পরিচ্ছন্নতার কী দারুণ ছাপ!’
কিশোয়ার কামাল বলেন, ‘অসাম্প্রদায়িকতার মূর্ত প্রতীক ছিলেন প্রতীতি দেবী। আমার কাছে মনে হয়েছে, তিনি এ যুগের মানুষ নন। অথচ কী দারুণভাবে সবার সঙ্গে মিশে যেতেন মাসিমা। এত উদার মনের মানুষ আমি কমই দেখেছি।’
অনুষ্ঠানে সোহানা আহমেদ এবং তার দলের সম্মেলক কণ্ঠে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ গানের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা শোনান রবীন্দ্রসংগীত ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’ এবং অতুল প্রসাদ সেনের ‘কে গো তুমি আসিলে অতিথি’।