পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী আজ ১ জানুয়ারি। কবিতা, গীত ও উপন্যাসে তিনি বাংলাদেশের গ্রাম্য জীবনের সুখ-দুঃখ, সংস্কৃতি ও লোকজ আত্মার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছিলেন। জসীমউদ্দীনের পূর্ণ নাম মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন মোল্লা। তিনি ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার কবিত্ব শক্তির প্রকাশ ঘটে ছাত্রজীবনেই।
গ্রামের মাটি ও মানুষের সঙ্গে তার অস্তিত্ব যেন অবিচ্ছেদ্যভাবে মিলেমিশে গিয়েছিল। গ্রামবাংলার জীবন, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ও সংগ্রামই হয়ে ওঠে তার কবিতার প্রধান উপজীব্য। কলেজজীবনে রচিত ‘কবর’ কবিতা তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই এই কবিতা প্রবেশিকা বাংলা সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়, যা একজন তরুণ কবি হিসেবে তার জন্য ছিল এক অসামান্য সাফল্য। এর মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যে তার শক্ত অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জসীমউদ্দীন সাহিত্যের নানা শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি গাঁথাকাব্য, খণ্ডকাব্য, নাটক, স্মৃতিকথা, শিশুসাহিত্য, গল্প ও উপন্যাস রচনা করেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাখালী’ প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’, ‘রঙিলা নায়ের মাঝি’, ‘মাটির কান্না’, ‘সুচয়নী’, ‘পদ্মা নদীর দেশে’, ‘ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে’সহ বহু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
তার রচিত ‘বাঙালীর হাসির গল্প’ ও ‘বোবা কাহিনী’ উপন্যাস দুটি পাঠকের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির প্রতিও জসীমউদ্দীনের গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি ‘জারিগান’ (১৯৬৮) ও ‘মুর্শিদি গান’ (১৯৭৭) নামে দুটি লোকসংগীত সংকলন সম্পাদনা করেন।
বাংলা কবিতার ধারায় জসীমউদ্দীনের স্থান স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট। তার কবিতা অনাড়ম্বর হলেও গভীরভাবে রূপময়। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও লোকজীবন তার কবিতায় নতুন শিল্পরূপ পেয়েছে। এ জন্যই তিনি ‘পল্লিকবি’ হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।
ব্যক্তিজীবনে জসীমউদ্দীন ছিলেন প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী। ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধের উদ্যোগ নিলে তিনি এর তীব্র প্রতিবাদ জানান।
১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও তা প্রত্যাখ্যান করেন জসীমউদ্দীন।
১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ এই কালজয়ী কবি মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৭৬ সালে একুশে পদক এবং ১৯৭৮ সালে স্বাধীনতা পদক (মরণোত্তর) লাভ করেন তিনি।