যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা নক্স কলেজে ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন তামিরুল মিল্লাত মাদরাসা থেকে আলিম পাস করা সাদ আল আমিন। প্রায় ৩ কোটি টাকার বৃত্তি পেয়েছেন তিনি। আল আমিনের জন্ম শরীয়তপুরের গোসাইরহাটে, বেড়ে উঠেছেন তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায়। কোরআনে হাফেজ হবেন এমনটাই স্বপ্ন ছিল তার মা-বাবার। তবে সে স্বপ্ন পূরণ না হলেও তার ফিল্মমেকার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় মায়ের একটি ছোট ফোনে প্রথম ফিল্ম বানান আল আমিন। তখন অনেক কিছুই বুঝতেন না তিনি। একসময় মনে হলো এই বিষয়ে তার উচ্চতর শিক্ষা নেওয়া উচিত। ইউটিউব দেখে নিজে নিজেই ফিল্ম মেকিংয়ের খুঁটিনাটি নানা বিষয় শেখেন তিনি। ফটোশপ, আফটার ইফেক্টস’সহ নানা সফটওয়্যারের কাজ দিনের পর দিন চর্চা করে নিজেকে দক্ষ করে তোলেন। উদ্দেশ্য, নিজের গল্পটা সুন্দর করে ক্যামেরায় তুলে ধরা।
সাদ আল আমিন মনে করেন, ভালো গল্প বলার জন্য খুব দামি সেটআপের দরকার হয় না। দরকার হয় সৃজনশীলতা আর গল্প বলার তীব্র ইচ্ছা।
ফিল্ম বানিয়ে নিয়মিত আয় এখনো শুরু হয়নি তার। কিন্তু কিছু ক্লায়েন্ট প্রজেক্ট ও ডকুমেন্টারি কাজ থেকে সম্মানি পেয়েছেন তিনি।
যেকোনো বড় অর্জনের পেছনের অনেক পরিশ্রম আর ত্যাগের গল্প থাকে। সাদ আল আমিনও এর বাইরে নন। তিনি পরিবার, বন্ধুবান্ধব থেকে নিজেকে আলাদা করে নিজের পথ খুঁজে নিয়েছেন। মানসিক চাপ, একাকিত্ব কখনো কখনো তাকে পেয়ে বসেছে। কিন্তু এসব সামলে তিনি এগিয়ে গেছেন নিজ গন্তব্যে। ফিল্ম, ডিজাইন, ডকুমেন্টারি যত যাই করেন না কেন পড়ালেখার পাশাপাশি করেছেন সব। তারপরও পেছনে কিছু মানুষ সমালোচনা করেছে কিন্তু সময়ের সঙ্গে কাজের গভীরতা ও উদ্দেশ্য সবাইকে বোঝাতে পেরেছেন তিনি। ফলে তেমন কেউ আর তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এখন অনেক শিক্ষক এবং বন্ধু তাকে নিয়ে গর্ব করেন।
নক্স কলেজে বৃত্তি পাওয়া তো সহজ কথা নয়। কীভাবে পেলেন জানতে চাইলে সাদ আল আমিন বলেন, ‘আমি ওবারলিন কলেজের শাহরিয়ার আবরার হিমেলের পরামর্শে আবেদন প্রস্তুত করি। নিজের প্রোফাইল, প্রজেক্টস, আর্টিকেল ও ভিডিও সাবমিট করি। অনলাইন ইন্টারভিউ দিই। ধাপে ধাপে সাপোর্ট পেতে থাকি, অবশেষে নক্স কলেজ থেকে স্কলারশিপের অফার আসে।’
এই অর্জন যেন শুরুতে আল আমিন নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। তিনি বলেন, ‘যখন ই-মেইলে অফার লেটার পেলাম, তখন কিছু সময়ের জন্য আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এটা ছিল স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মুহূর্ত। চোখে পানি চলে এসেছিল।’
তুলনামূলকভাবে মাদরাসাপড়ুয়া ছাত্রদের মধ্যে বৃত্তি পাওয়ার সংখ্যা খুব কম। এই ব্যাপারটা আল আমিনের চোখ এড়ায়নি। তিনি সেজন্য কিছু পরামর্শ দিলেন- ‘প্রথমত নিজের লক্ষ্য স্পষ্ট করুন, কী হতে চান তা নির্ধারণ করুন। দ্বিতীয়ত প্রতিদিন সময় দিন সেই লক্ষ্যের পেছনে। তৃতীয়ত আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক রাখুন। চতুর্থত যেই দেশের স্কলারশিপ চান, তাদের ভাষা শেখা শুরু করুন। পঞ্চমত অনলাইন টুলস ব্যবহার করুন। এক্ষেত্রে ইউটিউব আপনার শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে।’
সাদ আল আমিন দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের সঙ্গে শতাধিক ডিজাইন-প্রজেক্ট করেছেন। তার শর্ট ফিল্মের সংখ্যা ৮-১০টি, যার মধ্যে কয়েকটি অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছে। তবে এখনো তিনি শেখার মধ্যে আছেন বলে মনে করেন। অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন তার।
উচ্চশিক্ষা শেষে বাংলাদেশে ফিরে একটি ‘কনটেক্সচুয়াল লার্নিং কমপ্লেক্স’ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা তার। যেখানে ধর্ম, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতা একসঙ্গে শেখার সুযোগ পাবে তরুণরা। পাশাপাশি বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, লোককাহিনি ও কাওয়ালি ধারাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন। এসবই তার আগামী দিনের পরিকল্পনা। তার ওরিয়েন্টেশন শুরু আগামী ৭ সেপ্টেম্বর। এর আগেই ক্যাম্পাসে পাড়ি জমাবেন তিনি।
/রিয়াজ