জয়পুরহাটে চলতি আমন সংগ্রহ মৌসুমে সরকারি খাদ্যগুদামে চাল দেওয়ার চুক্তি না করায় ৬০টি হাসকিং মিলকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি তাদের লাইসেন্সও বাতিল করা হয়েছে।
সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো আর তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে না। চালকল মালিকরা বলছেন, বর্তমান বাজার দরের চেয়ে সরকারি গুদামে চালের মূল্য অনেক কম। উৎপাদন খরচ অনুযায়ী তাদের কেজিপ্রতি চালে ২ টাকা থেকে ৩ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। এতে অনেকে চাল দেওয়ার চুক্তি করেননি। আবার অনেকেই লাইসেন্স টিকিয়ে রাখতে লোকসান গুনে হলেও সরকারি গুদামে চাল দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জয়পুরহাট জেলায় প্রতিবছর প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের চাষ হয়। গেল আমন মৌসুমে এ জেলায় চাল উৎপাদন হয়েছিল দুই লাখ ৩০ হাজার টন। এর মধ্যে সরকারি খাদ্য গুদামে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ৪৯২ টন।
জেলায় মোট হাসকিং চালকল বা চাতাল রয়েছে ৩২৭টি। এর মধ্যে ২৬৭টি চাতালের মালিক ৪৭ টাকা কেজি দরে ৯ হাজার ৫৯৯ টন চাল সরকারি গুদামে সরবরাহের চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু সরকার চাল সংগ্রহের যে মূল্য নির্ধারণ করেছে, তা বাজারের চেয়ে কম। এ জন্য ৬০টি চালকল সরকারি গুদামে চাল সরবরাহের চুক্তি করেনি।
তারা বলছেন, উৎপাদন খরচ অনুযায়ী প্রতিকেজি চালে তাদের ৩ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হবে। এ ছাড়া গত কয়েক মৌসুমে সরকারের গুদামে চাল দিতে গিয়ে লোকসানে পড়ে অনেক মিল বন্ধ হয়ে গেছে।
জয়পুরহাট সদরের হিচমি বাজারের চাতাল মালিক খোকন হোসেন বলেন, ‘মিলের লাইসেন্স থাকলে কী, আর না থাকলেই কী। বর্তমানে চালের যে দাম তাতে সরকারি গুদামে দিলে কেজিপ্রতি সাড়ে ৩ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। প্রতিবছর যদি লাখ লাখ টাকা লোকসান হয় তাহলে ব্যবসা চালাব কীভাবে? এখন আমার চাতাল বন্ধ রয়েছে। সরকার যদি আমাদের ওপর সুদৃষ্টি দেয় তাহলে ভালো হয়।’
একই এলাকার চাতাল মালিক আলী হোসেন বলেন, ‘সরকারি মূল্যের চেয়ে বাজারে ধান-চালের দাম বেশি। তারপরও লাইসেন্স রক্ষা করতে গুদামে চাল দিয়েছি। সামনে যেন আমাদের লোকসান না হয়, এ জন্য সরকারকে বিষয়টি দেখার জন্য অনুরোধ করছি।’
ক্ষেতলাল উপজেলার নিশ্চিতা এলাকার বাসিন্দা মো. ফিরোজ বলেন, ‘প্রতিবছর সরকারি গুদামে চাল দিই। কিন্তু এ বছর ধানের দাম বেশি হওয়ায় এখনো সেখানে সব চাল দিতে পারিনি। যেহেতু ব্যবসা করতেই হবে তাই লোকসান হোক, আর লাভ হোক চাল দিতেই হবে।
জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আনোয়ারুল হক আনু বলেন, ‘বাজারে চালের মূল্য স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বেড়েছে। কারণ উৎপাদন খরচও ছিল বেশি। তারপরও কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষক যদি বাজারে ঠিকমতো ধান-চাল সরবরাহ না করেন তাহলে ধানের দাম বেড়ে যাবে। আর ধানের দাম বাড়লে চালের দামও বাড়বে।’
জয়পুরহাট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কামাল হোসেন বলেন, ‘চলতি আমন সংগ্রহ মৌসুমে জেলা থেকে ১০ হাজার ৪৯২ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু চালকল মালিকরা ৯ হাজার ৫৯৯ টন চাল দেওয়ার চুক্তি করেছিলেন। এরপর চুক্তিবিহীন মালিকদের কাছ থেকে আরও ৮৯২ টন চাল সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া খাদ্য অধিদপ্তরের অন্য বরাদ্দ থেকে আরও প্রায় ৭ হাজার টন চাল সংগ্রহ করা হবে। সব মিলিয়ে জেলায় এবার মোট লক্ষ্যমাত্রা ১৭ হাজার ৩০৭ টন। এরই মধ্যে ১৪ হাজার ৩০৭ টন চাল সংগ্রহ হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময় রয়েছে। এরপর হয়তো আবারও কিছু সময় বাড়ানো হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘৬০টি চালকল চুক্তি না করায় সেগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আর কালো তালিকাভুক্ত হওয়া মানেই লাইসেন্স বাতিল হওয়া। লাইসেন্স বাতিল হলে সেই মিলের সব কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।’