মৃৎশিল্প বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি দেশের অন্যতম প্রাচীন শিল্প। বর্তমানে প্লাস্টিকসহ আধুনিক নানা মানের পণ্যের দখলে বাজার চলে যাওয়ায় কুমোরদের এই আদি পেশা আজ বিলুপ্তির পথে। হারিয়ে যেতে বসা এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে নতুন করে সৃষ্টি হচ্ছে অনন্য শৈলীর নান্দনিক মাটির জিনিসপত্র। মনকাড়া ডিজাইন ও রঙের ছোঁয়ায় এসব পণ্য ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে।
ঝালকাঠি শহরে মাটির পণ্য তৈরি ও বিক্রির খ্যাতিতে একটি সড়কের নামই হয়ে গেছে ‘কুমারপট্টি’। যদিও এখন আর আগের মতো জৌলুস নেই। কয়েকটি দোকান এখনো অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
সেখানে এখন শুধু মাটির নয়, সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে বাঁশের তৈরি তৈজসপত্র ও কিছু সিলভার পণ্যও। এসব বাহারি মাটির পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন রণজিৎ পাল। তিনি শহরের কৃষ্ণকাঠি এলাকার নির্মল চন্দ্র পালের ছেলে। তার পূর্বপুরুষও কুমোর পেশায় নিয়োজিত ছিল। নিজ বাড়ির পাশেই তিনি মাটির জিনিস তৈরি করেন। সেগুলো পুড়িয়ে দোকানে নিয়ে বিক্রি করেন। তিনি খুচরা ও পাইকারি দামে পণ্য বিক্রি করছেন।
রণজিৎ পাল বলেন, ‘মানুষের রুচির পরিবর্তন ঘটছে প্রতিনিয়ত। এ কারণে আগের জৌলুস হারিয়েছে মাটির পণ্য। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। আমাদের অনেকেই অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। বর্তমানে আমাদের পেশা টিকিয়ে রাখতে উন্নয়ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে এখানকার মৃৎশিল্পীরা দৃষ্টিনন্দন, টেকসই মাটির পণ্য তৈরি করছেন। আধুনিক মানের মাটির কাপ-পিরিচ, প্লেট, ফুলদানি, টেরাকোটা, ওয়াল টাইলসসহ নান্দনিক সব পণ্য তৈরি করছি। সৃজনশীল রুচিসম্পন্ন লোকজন সেগুলো ক্রয় করছেন। ২০ টাকা থেকে শুরু করে দেড় শ টাকা পর্যন্ত দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাজারে এসব পণ্যের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। দামও ভালো পাচ্ছি। এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানিযোগ্য। বিদেশে রপ্তানি হলে আমাদের আয় বৃদ্ধি পাবে। নতুনরাও এই শিল্পে আগ্রহী হবে।’
মৃৎশিল্পী লক্ষ্মী রানি পাল বলেন, ‘হাত ও পায়ের সাহায্যে মাটি প্রক্রিয়া করে বিভিন্ন ডিজাইনের ছাঁচে পণ্য তৈরি করছি। খুব সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করলে মানুষের কাছে এখনো চাহিদা আছে। দামও ভালো পাচ্ছি।’
মৃৎশিল্পী রামপদ পাল বলেন, ‘আধুনিক মেশিনে প্রস্তুতকৃত মাটি দিয়ে, জিগার মেশিনের সাহায্যে খুব সহজেই নান্দনিক ডিজাইনের স্বাস্থ্যসম্মত দইয়ের খুলি, ফুলের টব, ফুলদানি, কাপ-পিরিচ, মগ ও প্লেট তৈরি করা যায়। এ মেশিনে উন্নতমানের পণ্য তৈরি করতে পারায় ক্রেতাদের চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভালো মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব হয়। সরকারের কাছে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এই মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখতে আধুনিক মেশিন স্থাপন ও কারিগরদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার দাবি জানাই। দক্ষ কারিগরের নিপুণ হাতে অনন্য শৈলীতে তৈরি নান্দনিক মৃৎশিল্প বেশি বেশি বিক্রি করতে পারলে আমাদের জীবনমান আরও উন্নত হবে।’