গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়নের সিলনা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কৃষক সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস। এ বছর ৫৪ শতাংশ জমিতে আবাদ করেছিলেন আমন ধানের। ইতোমধ্যে জমির ধানও পেকেছিল। অপেক্ষায় ছিলেন পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার। আর এ ধান দিয়েই সারা বছর ভাতের যোগান দেওয়ার পাশাপাশি কিছু ধান বিক্রি করে চালাবেন ১০ জনের সংসার। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন নষ্ট করে দিল দমকা হাওয়া ও প্রবল বৃষ্টি। জমির পাকা-আধা পাকা ধানগাছগুলো হেলে পড়ে পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তা এখন নষ্ট হতে বসেছে।
কৃষক সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘সংসারে স্ত্রী, ছেলে, নাতিসহ ১০ জনের পরিবার। এ বছর ৫৪ শতাংশ জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছি। জমির ধানও পেকেছিল। ভেবেছি কয়েকদিন পর পাকা ধান কেটে ঘরে তুলব, আর বাকিটা পাকার পর কেটে নিয়ে যাব। কিন্তু এই ধান আর ঘরে তুলতে পারলাম না। ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টিতে হেলে পড়ে পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান এখন নষ্ট হতে বসেছে। সারা বছর কীভাবে চলব তা চিন্তাই করতে পারছি না।’
শুধু সুভাষ চন্দ্র নয়, এমন অবস্থা কয়েকটি গ্রামের শতাধিক কৃষকের। তবে জেলায় এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ করতে পারেনি কৃষি বিভাগ।
তবে কৃষি বিভাগ বলছে, ধান দ্রুত কেটে নিলে ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় ১২ হাজার ৩০৮ হেক্টর জমিতে আমান ধানের আবাদ করা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড, ৮ হাজার ২০৩ হেক্টর জমিতে উফশী এবং ২ হাজার ৩১৭ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের আমন ধান চাষ করেছেন কৃষকরা।
রবিবার (২ নভেম্বর) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, শনিবার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় জেলাজুড়ে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জমি তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া ঝড়ো হাওয়ায় হেলে পড়েছে পাকা আমন ধানের গাছ। কেটে রাখা পাকা ধান ঘরে তোলার অপেক্ষায় থাকলেও জমিতে জলাবদ্ধতা ও নিচু জমির ধানগাছ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে শ্রমিক সংকট থাকায় পানিতে তলিয়ে যাওয়া ও হেলে পড়া ধানগাছ কাটতে বিপাকে পড়তে হচ্ছে কৃষকদের। ফলে সারা বছর পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে চলবেন সেই চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছে তাদের।
শুধু ধানই নয়, জমিতে হাঁটু পানি থাকায় উচ্ছের চারা নষ্ট হয়েছে। অনেক জমি থেকে পানি না নামা পর্যন্ত উচ্ছের চারা রোপণ করতে পারছেন না কৃষকরা। কয়েকদিন দেরি হলে এসব উচ্ছের চারা জমিতে আর রোপণ করা যাবে না।
এদিকে, কৃষকদের অভিযোগ, এমন দুর্যোগ অবস্থায় তাদের কোনো খোঁজ নেয়নি কৃষি বিভাগ। ধার-দেনা করে ধানের চাষ করলেও স্বপ্নের ফসল নষ্ঠ হওয়ায় চিন্তায় পড়েছেন তারা। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারি সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
কৃষক মহানন্দ দে বলেন, ‘আগে বিঘাপ্রতি ৪০ মণ ধান পেতাম। তবে বৃষ্টি হয়ে ধানগাছ হেলে পড়ায় ও তলিয়ে যাওয়ায় অর্ধেক মণ ধান পাব কি-না সন্দেহ। ধান নষ্ট হওয়ায় তা ৮০০ টাকা মণ বিক্রি করতে পারব কি-না সেই সন্দেহও রয়েছে। এ ছাড়া এই ধান কাটতে আগে ৭-৮ জন শ্রমিক লাগলেও এখন লাগবে অন্তত ১৫ জন শ্রমিক। এতে একদিকে যেমন আমরা ধান হারিয়েছি, অন্যদিকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’
সিঙ্গারকুল গ্রামের কৃষক বিশ্বম চন্দ্র সরকার বলেন, ‘জমিতে ধান পাকলেও বৃষ্টির কারণে তা নষ্ট হতে বসেছে। পানিতে তলিয়ে গিয়ে তা গজিয়ে যাচ্ছে। এ ধান না যাবে খাওয়া, না যাবে বিক্রি করা। এমনকি খড়গুলোও পচে যাচ্ছে, যা গরুকেও খাওয়া যাবে না। এ ছাড়া এই জমির ধান কেটে উচ্ছের চারা রোপণ করতাম। কিন্তু জমিতে পানি থাকায় এখন আর চারা রোপণ করা যাচ্ছে না। উচ্ছের চারার বয়স বেশি হলে তা আর রোপণ করে কোনো লাভ হয় না। ধার-দেনা করে ফসল ফলিয়েছি। এখন এই ধার-দেনা কীভাবে মেটাব এবং সারা বছর কীভাবে চলব সেই চিন্তায় দিন কাটছে।’
কৃষক মফিজুর ইসলাম বলেন, ‘এমন একটা দুর্যোগ গেলেও কোনো কৃষি কর্মকর্তা আমাদের খোঁজ নেয়নি। শুধু আজ নয়, কোন সময়ই আমাদের খোঁজ-খবর নেওয়া হয় না। আমরা তাদের কাছ থেকে কোনো পরামর্শও পাই না। এখন সরকার যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দেয় তাহলে আমাদের মরণ ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’
গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘শনিবার বৃষ্টিতে জেলায় ধানসহ কিছু ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণে কাজ চলছে। ক্ষতি কমাতে দ্রুত ধান কেটে ঘরে তুলতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রণোদনা দিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হবে।’
বাদল/এসজি/