কাগজে-কলমে কারখানার মালিক একজন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালাচ্ছেন অন্যজন। মূল মালিকের কাছ থেকে তিনি জায়গাটি ভাড়া নিয়েছেন। কোনো কারখানা আবার জনমানবশূন্য হলেও কোনোটিতে শ্রমিকরা দম ফেলার সময় পাচ্ছেন না। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেখানে খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। বন্ধ থাকা কারখানাগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠান তদারকের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। ময়মনসিংহ নগরীর মাসকান্দা বাণিজ্যিক এলাকায় প্রতিষ্ঠিত বিসিক শিল্প নগরীর চিত্র এটি। এ ছাড়া বরাদ্দ পাওয়া অনেক প্লট কোনো কাজে না লাগিয়ে নিজেদের দখলে রাখায় নতুন করে প্লট বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিসিকের মধ্যে থাকা কারখানাগুলোর ভবন বাইরে থেকে চকচকে হলেও ভেতরের পরিবেশ ভিন্ন। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এগুলোর মধ্যে খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। ঢাকা মিষ্টি মুখ, লাজিজ মিষ্টি ও সূর্যমুখী মুড়ি কারখানায় ভেতরে গিয়ে ভয়াবহ পরিবেশ দেখা যায়। একটি সরিষার তেল উৎপাদনের প্রতিষ্ঠানেও একই চিত্র দেখা যায়।
বিসিকে প্রবেশের পর ডান দিক ধরে একেবারে শেষ প্রান্তে গেলে দেখা মেলে ‘সূর্যমুখী মুড়ি’র কারখানা। ভেতরে ঢুকে দেখা যায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। আগুনের তাপে শ্রমিকদের শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। খালি পায়ে মুড়ির ওপর পা রেখে বালতিতে করে বস্তায় ভরা হচ্ছে। ড্রামে রাখা পানির সঙ্গে কিছু একটা মেশানো হচ্ছে।
মুড়ির কারখানা থেকে বের হতেই সেখানে একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তিনি পাশের আরেকটি কারখানার কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ক্ষতিকর হাইড্রোজ ও ইউরিয়া মেশানো পানি ব্যবহার করে সেখানে মুড়ি তৈরি করা হয়। এতে সাদা চকচকে ফুলে ওঠা মুড়ি বেশি দামে বাজারে বিক্রি করা যায়।’
তবে সূর্যমুখী মুড়ির কারখানার মালিক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ হাইড্রোজ ও ইউরিয়া মেশানোর বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘অন্য কারখানায় মুড়িতে হাইড্রোজ ও ইউরিয়া মেশানো পানি ব্যবহার করা হয় কি না জানি না, তবে আমার কারখানায় এগুলো হয় না। মুড়ির স্বাদ বাড়াতে ও চকচকে করতে লবণ মেশানো পানি ব্যবহার করা হয়।’ এ সময় তিনি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ঠিক করার প্রতিশ্রুতি দেন।
কথা হয় ‘লাজিজ মিষ্টি’র কারখানার ম্যানেজার মো. জামালের সঙ্গে। তার প্রতিষ্ঠানটি এখানে ভাড়া নেওয়া জায়গায় পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এই প্লটটি আরেকজনের নামে বরাদ্দ। আমাদের মালিক তিন মাস আগে ভাড়া নেন। প্রতি মাসে ভাড়া বাবদ ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়।’ তার কারখানার দইয়ে মাছি বসার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘দইয়ের পাত্র আর মাটিতে রাখব না। সবসময় কারখানা পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করি।’
ঢাকা মিষ্টি মুখের কর্মচারী মো. সাগর বলেন, ‘আমাদের কারখানার পরিবেশ অন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ভালো। তবে আরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করা হবে।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কারখানার এক কর্মচারী জানিয়েছেন, ‘সরকারি সব নিয়ম রক্ষা করে খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা হয় না। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের খবর এলে তড়িঘড়ি করে পরিবেশ ভালো করার চেষ্টা করা হয়।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৮ সালে ১০ দশমিক ৮১ একর জায়গা নিয়ে বিসিক শিল্প নগরী প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে আরও ৯ দশমিক ৬২ একর জায়গা নিয়ে পরিধি সম্প্রসারণ করা হয়। ১৯৮১ সালে এখানে কার্যক্রম শুরু হয়। এখানে থাকা ১০৫টি প্লট ৯৯ বছরের জন্য ইজারা (বরাদ্দ) দেওয়া হয়। ৯৩টি শিল্প ইউনিটে বর্তমানে ৮৭টি ছোট-বড় কারখানা চালু রয়েছে। বাকিগুলো বন্ধ।
গত এক বছরে দুটি শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়েছে জানিয়ে বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক বিজয় কুমার দত্ত বলেন, ‘প্লট পাওয়া ব্যক্তিরা অন্য কোথাও ভাড়া দিতে চাইলে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। তবে অনেকেই এমন করছেন কি না তা খোঁজ নেওয়া হবে।’
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রেজা মো. গোলাম মাসুম প্রধান বলেন, ‘বিসিকে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশসহ খাদ্যে ভেজাল থাকার প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’