শীতের বিদায়ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে আমের ‘রাজধানী’খ্যাত রাজশাহী অঞ্চলে শুরু হয়েছে নতুন আশার মৌসুম। গাছে গাছে ফুটতে শুরু করেছে আমের মুকুল, চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে মিষ্টি সুবাস। বাঘা, চারঘাট ও পুঠিয়াসহ রাজশাহীর বিস্তীর্ণ জনপদের আমবাগানগুলো এখন সবুজ পাতার ফাঁকে হলুদাভ মুকুলে সেজে উঠছে। প্রাথমিক পর্যায়ের এই প্রাচুর্যকে ঘিরে কৃষকদের চোখে-মুখে বাম্পার ফলনের স্বপ্ন।
কৃষিসংশ্লিষ্টরা জানান, মৌসুমের শুরুতেই মুকুলের উপস্থিতি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকা এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের ওপরই নির্ভর করবে চূড়ান্ত ফলন। বিশেষ করে অতিরিক্ত কুয়াশা বা অকাল বৃষ্টিপাত হলে মুকুল ঝরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহী অঞ্চলে ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আমচাষ হয়েছে। এতে উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ টন আম। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও একই পরিমাণ জমিতে চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার টন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অনুকূল আবহাওয়া পেলে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করাও সম্ভব।
চারঘাট উপজেলার কালুহাটি গ্রামের আমচাষি মোজাফফর হোসেন জানান, এ বছর আগেভাগেই মুকুল এসেছে। কুয়াশা যদি বেশি না পড়ে, তাহলে এবার ফলন ভালো হবে।
একই উপজেলার আরেক চাষি মাহফুজ আলী জানান, নিয়মিত পরিচর্যা করলে ফলন ভালো হয়। তিনি ইতোমধ্যে গাছে গাছে মুকুল দেখতে পাচ্ছেন। তবে শোষক পোকার আক্রমণ নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে। সময়মতো দমন না করলে উৎপাদনে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
এ অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী জাতের পাশাপাশি নতুন জাতের চাষও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে আম্রপালি, বারি-৩ ও বারি-৪ জাতের আমবাগান সম্প্রসারণে আগ্রহী হচ্ছেন কৃষকরা। তুলনামূলক কম জায়গায় বেশি ফলন এবং বাজারে ভালো দামের কারণে এসব জাত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ জেলা নওগাঁতেও আমচাষে উল্লেখযোগ্য বিস্তার ঘটেছে। একসময় ধানের জন্য পরিচিত এই জেলা গত বছর আম উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসে। অন্যদিকে ঐতিহ্যগতভাবে বৃহৎ আমবাগানের জন্য পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ এখনো আয়তনের দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও জমি বৃদ্ধির হারে নওগাঁ এগিয়ে।
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার আমচাষি শাকিল আহমেদ জানান, গত বছর শীত ও কুয়াশা তুলনামূলক বেশি হলেও এবার আবহাওয়া আমের অনুকূলে। বর্তমানে শীতের মৌসুমও শেষ হওয়ায় গাছে গাছে ফোটা আমের মুকুল নষ্ট হওয়ার আর শঙ্কা নেই। ফলে এবার আরও ভালো ফলনের আশা করা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, গত এক দশকে নওগাঁয় আমচাষের জমি দেড় গুণ বেড়েছে। একই সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জেও বিস্তার ঘটেছে। তবে তুলনামূলক কম। শুধু আয়তনই নয়, বদল এসেছে চাষপদ্ধতিতেও। আগে যেখানে শতবর্ষী বাগানের পরিকল্পনায় আমগাছ লাগানো হতো, এখন অনেক কৃষক ৮-১০ বছরের বাণিজ্যিক লক্ষ্য সামনে রেখে উচ্চ ঘনত্ব পদ্ধতিতে বাগান করছেন। এতে দ্রুত ফলন পাওয়া যায় এবং বাজারে চাহিদা অনুযায়ী জাত পরিবর্তনও সহজ হয়।
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু গাছে মুকুল এসেছে। বাকিগুলোতেও পর্যায়ক্রমে আসবে। গত বছরের তুলনায় এবার মুকুলের হার বেশি হতে পারে। তাই কৃষকদের প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া ও বাগান ব্যবস্থাপনায় সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’