গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বানিয়ারচর গ্রামে ‘সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন’ অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নামমাত্র খরচে এই প্রতিষ্ঠানটি ফিজিওথেরাপি, স্পিচ থেরাপি ও পুনর্বাসন সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
চিকিৎসা ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়ায় এখানে প্রান্তিক পঙ্গু, প্রতিবন্ধী ও স্ট্রোকজনিত প্যারালাইসিস রোগীরা সুস্থ হয়ে উঠছেন। ফলে স্থানীয় দরিদ্র মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে।
উপজেলার জলিরপাড় ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামের সোহেল মোল্লার ছেলে সাজ্জাদ মোল্লা (১২)। বাকা পা ও মুখপ্রতিবন্ধী সমস্যা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা এই শিশুটি এখানে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠছে। শিশু সাজ্জাদের মা শিউলী আক্তার জানান, ছেলেটির জন্য আমরা ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছি। তবে কোনো সঠিক ফল পাওয়া যায়নি। ডাক্তাররা বলেছেন, তাকে প্রতিদিন ফিজিওথেরাপি ও স্পিচ থেরাপি দিলে সে একদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে। কিন্তু শহরের ব্যয়বহুল চিকিৎসা আমাদের জন্য সম্ভব ছিল না।
তখন ‘সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন’ শিউলী আক্তারকে আশা দেখিয়েছে। এখানে মাত্র দুই মাস চিকিৎসাসেবা নেওয়ার পর ছেলেটি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছে। আগের তুলনায় স্পষ্টভাবে কথা বলতেও শুরু করেছে। তিনি বলেন, ‘এখানে এক ঘণ্টার ম্যাসেজের জন্য ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এটি আমাদের জন্য অনেক বড় সহায়তা।’
স্ট্রোকজনিত প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার রুহিদাস বিশ্বাস (৫৫)। তিনি বলেন, ‘ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও কোনো ভালো ফল হয়নি। তবে এখানে এসে সকাল-বিকেল ৩০০ টাকায় থেরাপি নিয়ে অনেক ভালো ফল পেয়েছি।’
২০২৩ সালের জুন মাসে সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশন কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে এটি শারীরিক প্রতিবন্ধী, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধী, ডাউনসিনড্রোম ও অটিজম আক্রান্ত শিশুদের মনো ও দৈহিক বিকাশে কাজ করছে। এখানে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকেন।
এ জন্য তিনজন চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপি সহকারী ও ৩২ জন নিবেদিত কর্মী তাদের পরিশ্রম দিয়ে মানুষের জীবন উন্নত করার চেষ্টা করে চলেছেন। শুধু চিকিৎসাসেবা নয় এলাকার বেকার যুবসমাজকে কর্মমুখী করতে প্রতিষ্ঠানটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে ফাউন্ডেশনটির সম্প্রসারণে সরকারি জায়গা বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি কোরিয়ার ডু বিফোর সংস্থার বাংলাদেশে নিযুক্ত দুই প্রতিনিধি ডু ইল কিম ও ইয়ুন জং বেইক সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশনটির বানিয়ার সেন্টার পরিদর্শন করেছেন। তারা এই কার্যক্রম দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
বানিয়ারচর গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ অমল রায় (৮০) বলেন, ‘খেয়াঘাট সংলগ্ন একটি ছোট্ট ভাড়া বাসায় এই মানবিক উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তখন এটি ছিল সীমিত সামর্থ্যে শুরু হওয়া একটি ছোট প্রচেষ্টা। তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও মানবসেবার প্রতি দৃঢ় মনোভাবের কারণে আজ এটি এলাকার মানুষের কাছে এক ভরসার জায়গা। এলাকার মানুষ এখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা, ফিজিওথেরাপি, খাদ্য বিতরণ ও পুনর্বাসন সেবা পেয়ে থাকেন।’
ফিজিওথেরাপি সহকারী অর্পিতা সরকার জানান, এখানে আসা রোগীদের বেশির ভাগই দরিদ্র। শহরের মতো সেবা এখানে পেয়ে তারা অত্যন্ত খুশি ও উপকৃত।
চিকিৎসক শুভ্রা শিকদার বলেন, ‘আমি ফিজিওথেরাপি ডিগ্রি নিয়ে এখানে কাজ শুরু করেছি, যাতে আমার এলাকার মানুষের সেবা দিতে পারি। এখানে স্থানীয় ও নানা জায়গা থেকে রোগীরা আসেন ও চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে যান। এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!’
সম্প্রীতি এইড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাভারঞ্জন শিকদার বলেন, ‘আমি ছাত্রকাল থেকেই মানবতার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছি। এখন নিজগ্রামে এই সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত।
এই উদ্যোগ এলাকার দরিদ্র ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি বড় অবদান রাখছে। অভ্যন্তরীণ পরিষেবায় পাঁচটি শয্যা থাকলেও সরকারি সহযোগিতা পেলে ১৫ শয্যায় উন্নত করা সম্ভব হবে।