পদ্মা নদীর একটি শাখা কুমার নদ। বহু বছর ধরে এটি ফরিদপুর শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জনজীবনের অংশ। শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা এই নদের পানি এক সময় ব্যবহার হতো গোসল, রান্নাবান্না থেকে শুরু করে নিত্যদিনের নানা কাজে। সময়ের সঙ্গে সেই চেনা নদের চিত্র বদলে গেছে।
পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় এই জলাধার এখন শহরের আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পৌর এলাকার প্রায় ৭০ শতাংশ পয়ঃবর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে কুমার নদে। শহরের বহু বহুতল ভবন ও বাসাবাড়ির সেপটিক ট্যাংকের লাইন সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে সরকারি ড্রেনের সঙ্গে। সেই ড্রেনের নোংরা পানি নালা হয়ে মিশছে নদের বুকে।
এতে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে পানি, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি; হুমকির মুখে পড়ছে নদীকেন্দ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। সেই সঙ্গে কমছে পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে পৌরসভার আয়।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, ফরিদপুর পৌর এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৩৮ হাজার নিবন্ধিত বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে পানির লাইনের গ্রাহক প্রায় ১০ হাজার। এ ছাড়া বাসাবাড়ি ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য নির্ধারিত সংযোগ রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার। কিন্তু নিয়ম মেনে পৌরসভার মাধ্যমে মল ও বর্জ্য পরিষ্কার করে মাত্র ৩ হাজারের মতো হোল্ডিংধারী। বাকি বড় একটি অংশ অবৈধভাবে ড্রেন ও নালার মাধ্যমে সেপটিক ট্যাংকের সংযোগ করে কিংবা অন্য উপায়ে বর্জ্য অপসারণ করছে।
এই অবৈধ ব্যবস্থার কারণে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টন পয়ঃবর্জ্য কুমার নদে গিয়ে পড়ছে। দিনের পর দিন এসব বর্জ্য জমে নদকে ভয়াবহ দূষিত করছে। স্যানিটেশন আইন অনুযায়ী, প্রতিটি বাড়ির সেপটিক ট্যাংক ৩ থেকে ৫ বছর পরপর পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ফরিদপুর পৌরসভার চিত্র যেন তার উল্টো। অনেক ভবনে সেপটিক ট্যাংকের পাশাপাশি সোকওয়েল থাকার কথা থাকলেও সেটিও নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পুরো শহরে মাত্র ৩০টি পরিবার তাদের সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করিয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫টি পরিবার এই সেবা নেয়। অর্থাৎ মাত্র ৩০ শতাংশ পরিবার বৈধভাবে বর্জ্য নিষ্কাশন করছে। বাকি ৭০ শতাংশই অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছে।
এর প্রভাব পড়ছে পৌরসভার আয়েও।
পয়ঃনিষ্কাশন ও পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনব্যবস্থা (সিআরপিসি) চালুর পর ২০২৩ সাল থেকে সেপটিক ট্যাংকের মল পরিষ্কার বাবদ প্রতিবছর কয়েক লাখ টাকা আয় হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই আয় কমে গেছে। কিন্তু নাগরিকরা অবৈধভাবে ড্রেনে সংযোগ দেওয়ায় গত কয়েক বছরে পৌরসভার সেই আয় কমে গেছে।
কুমার নদের এই ভয়াবহ অবস্থা নিয়ে আগেও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তখন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন উদ্বেগ প্রকাশ করে। বাজারের ময়লা-আবর্জনা ও ড্রেনের পয়ঃবর্জ্য নদীতে না ফেলতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই সঙ্গে পৌরসভাকে ড্রেনের বর্জ্য নিষ্কাশনের বিকল্প ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আড়াই বছর পার হলেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি।
শহরের পূর্ব খাবাসপুর মহল্লার বাসিন্দা আব্দুল হান্নান মিয়া বলেন, ‘আমরা আগে এই নদে গোসল করতাম। রান্নাবান্নাসহ বাসাবাড়ির নানা কাজে এই পানি ব্যবহার করা হতো। অনেকে অজুও করতেন। কিন্তু এখন এই পানিতে শরীর ভেজালেই চুলকানি হয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা মফিজ ইমাম মিলন বলেন, ‘যারা সরাসরি ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে পয়ঃবর্জ্য ফেলছেন, তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। একই সঙ্গে যেসব বাড়িতে নিয়ম মানা হচ্ছে না, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’
ফরিদপুর নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা পান্না বলেন, ‘কুমার নদ ফরিদপুরের অক্সিজেন ভাণ্ডার। এর দূষণ রোধ করা এখন সময়ের দাবি।’
পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন) সৈয়দ মো. আশরাফ জানান, চলতি মাস থেকেই অবৈধ লাইনগুলো উচ্ছেদের ব্যাপারে বিশেষ অভিযান চালানো হবে। যেসব বাড়িতে ড্রেনের সঙ্গে পয়ঃবর্জ্যের লাইনের সংযোগ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী বলেন, যদিও আমি নতুন যোগদান করেছি। পৌর শহরের যতো ময়লা-আর্বজনা ড্রেনের মাধ্যমে নদে যায়। আসলে আমাদের এ আবর্জনার জন্য নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় এমনটি হচ্ছে। তবে শহরের আর্বজনা ও ড্রেনের ময়লা পানি যেন কুমার নদে না পড়ে, সে বিষয়ে আলোচনা করে বিকল্প ব্যবস্থার চেষ্টা করা হবে।