এক পাশে ষষ্ঠ শ্রেণির ক্লাস, অন্য পাশে সপ্তম শ্রেণি। মাঝখানে বাঁশের চাটাইয়ের বেড়া। শ্রেণিকক্ষ সংকটে এমন পরিবেশেই চলছে পাঠদান। অথচ মাথার উপরেই আছে একটি দোতলা ভবন। তবে সেখানে নেই সিঁড়ি। ফলে চার বছর ধরে সম্পূর্ণ অচল হয়ে আছে ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটির দোতলা।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার তালতলা সপ্তপল্লী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নয়ন ও উদাসীনতার এমন নজির দেখা গেছে। এতে শ্রেণিকক্ষ সংকটে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ও পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালের ১ জানুয়ারি বালিয়াকান্দি সদর উপজেলার তালতলা গ্রামে ৬৬ শতক জমিতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টির মোট জমির পরিমাণ ৭৬ শতক। বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৩৫ জন। শিক্ষক ও কর্মচারী আছেন ১৮ জন। বিদ্যালয়ে তিনটি ভবন রয়েছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মিত তিন কক্ষবিশিষ্ট একতলা প্রশাসনিক ভবনে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ, অফিস সহকারী ও শিক্ষকদের বসার জায়গা এবং কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে। একটি টিনশেড ভবনে রয়েছে দুটি শ্রেণিকক্ষ। তবে সমস্যা মূলত নতুন দোতলা একাডেমিক ভবনটি নিয়ে।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে জেলা পরিষদের অর্থায়নে ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রশাসনিক ভবনের পাশে প্রায় চার শতক জমিতে দোতলা একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। সেই টাকায় শুধু ভবনের নিচের অংশের পিলারের কাজ করা হয়। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর আরও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। তখন নিচতলার দুটি কক্ষসহ আংশিক কাজ শেষ হয়।
২০১৯-২০ অর্থবছরে জেলা পরিষদ থেকে আবারও ৫ লাখ টাকা পাওয়া গেলে নিচতলার বাকি কাজ শেষ হয়। কক্ষ সংকটের কারণে তখন থেকেই নিচতলার দুটি কক্ষে বাঁশের চাটাইয়ের বেড়া দিয়ে অস্থায়ীভাবে ক্লাস শুরু করা হয়।
সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে দোতলার বর্ধিত অংশ নির্মাণে জেলা পরিষদে আবেদন করলে আরও ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই টাকায় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দোতলায় দুটি কক্ষ ও ছাদ তৈরি করে। কিন্তু সিঁড়ি নির্মাণ না করেই কাজ শেষ করে চলে যায়। ফলে চার বছর ধরে দোতলা সম্পূর্ণ অব্যবহৃত পড়ে আছে।
সিঁড়িসহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য গত ৬ মে আবারও জেলা পরিষদে বরাদ্দের আবেদন করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
পাঠদানরত অবস্থায় বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বিকাশ কুমার রায় বলেন, ‘আমি ষষ্ঠ শ্রেণির ক্লাস নিচ্ছি। পাশে চলছে সপ্তম শ্রেণির ক্লাস। মাঝখানে শুধু বাঁশের চাটাইয়ের বেড়া। শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করতে পারছে না। এক ক্লাসের কথা অন্য ক্লাসে চলে যায়। আমাদের শ্রেণিকক্ষ সংকট এখন মারাত্মক। দ্রুত সিঁড়ির ব্যবস্থা হলে সমস্যার সমাধান হবে।’
বিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী শিক্ষক তুষার কান্তি রায় বলেন, ‘দোতলা ভবনে আপাতত যে অবস্থা, তাতে সিঁড়ি থাকলেই ক্লাস নেওয়া যেত। কিন্তু সিঁড়ি না থাকায় চার বছর ধরে এটি পড়ে আছে। আমরাও মনোযোগ দিয়ে ক্লাস নিতে পারছি না।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণবন্ধু রায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা জেলা পরিষদ, শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ ও ইউএনওর কাছে বারবার আবেদন করেছি। কিন্তু কেউ সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসেনি। শুধু একটা সিঁড়ি হলেই আমাদের এই বড় সংকটের সমাধান হয়ে যেত।’
সিঁড়ি ছাড়া দোতলা ভবনের বিষয়টি কয়েক মাস আগে জানতে পেরেছেন বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দ্রুত ব্যবস্থা নিতে উপজেলা পরিষদ থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও অর্থ বরাদ্দের চাহিদা জানিয়ে আবেদন করা হয়েছে।’
তবে রাজবাড়ী শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বদরুল আলম পুরো দায় চাপিয়েছেন জেলা পরিষদের ওপর। তিনি বলেন, ‘তারা যখন দোতলা ভবনের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিলেন, তখন কেন সিঁড়ির ব্যবস্থা রাখলেন না? এখন আমাদের কাছে জরুরি অর্থ বরাদ্দের কোনো ব্যবস্থা নেই। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।’
অন্যদিকে রাজবাড়ী জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির এবং সহকারী প্রকৌশলী মো. আরমান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও, তারা কেউই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।