একসময় রাত-দিন শ্রমিকদের পদচারণায় মুখর থাকত সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল। সকাল হলেই কারখানামুখী মানুষের ভিড়ে ব্যস্ত হয়ে উঠত সড়ক। আর সন্ধ্যা নামলেই বাজার, দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে ফিরত প্রাণচাঞ্চল্য।
কিন্তু গত প্রায় ২১ মাসে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এই সময়ে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে ছোট-বড় ১৪১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। ফলে বেকারত্ব আর অনিশ্চয়তার মাঝে জীবন কাটাচ্ছে এই এলাকার হাজারও শ্রমিক পরিবার। এর প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ীদের মাঝেও।
শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত সাভার ও আশুলিয়ায় মোট ১৪১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১২২টি কারখানা স্থায়ীভাবে ও ১৯টি অস্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে। এতে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।
বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন লিমিটেড, বসুন্ধরা গার্মেন্টস লিমিটেড, ছেইন অ্যাপারেলস লিমিটেড, নাসা গ্রুপ, বার্ডস গ্রুপ ও গোল্ড ট্যাক্স গার্মেন্টস লিমিটেডসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।
কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমিকরা। দীর্ঘদিন চাকরি না পেয়ে অনেকেই পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ ভাসমান ব্যবসায়ী, কেউ রাজমিস্ত্রির জোগালি, আবার কেউ রিকশা বা অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। অনেকে এলাকায় টিকে থাকতে না পেরে গ্রামে ফিরে গেছেন।
বন্ধ নাসা গ্রুপের পোশাকশ্রমিক আলেয়া আক্তার কয়েক মাস ধরে বেকার। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন কারখানায় ঘুরেও কাজ জুটছে না। আগে স্বামী-স্ত্রী দুজনের আয় দিয়ে সংসার ভালোই চলত। এখন স্বামী রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছে। গত ঈদে সন্তানদের নতুন পোশাক কিনে দিতে পারিনি। ভালো খাবারও খাওয়াতে পারিনি। এবার কোরবানির ঈদও হয়তো একইভাবে কাটবে।’
আশুলিয়ার একটি সোয়েটার কারখানায় অপারেটর পদে কাজ করতেন শাহজাহান মিয়া। কয়েক মাস আগে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন তিনি অটোরিকশা চালান। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘কারখানায় কাজ করে ভালো আয় ছিল, সম্মানও ছিল। এখন রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতে হয়। আত্মীয়স্বজনের কাছে মুখ দেখাতে লজ্জা লাগে। আগে সহকর্মীদের সঙ্গে ভাগে কোরবানি দিতাম। গত বছর পারিনি, এবারও পারব না।’
কারখানা বন্ধের কিছুটা প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও। সাভারের কলমা এলাকার ফার্মেসি ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে মাসে দোকান থেকে লাখ টাকার মতো আয় হতো। এখন সেটা ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। আমার দোকানের প্রধান ক্রেতাই বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানার কর্মীরা। শ্রমিক কমে যাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে ব্যবসার পাশাপাশি একটি ডেভেলপার কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগে চাকরি নিয়েছি।’
একই অবস্থা স্থানীয় অনেক বাড়িওয়ালাদেরও। আশুলিয়ার গাজীরচট এলাকার বাড়িওয়ালা সাইদুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘আমার বাড়ির ৩০টি রুমের সব ভাড়াটিয়াই ছিল গার্মেন্টস শ্রমিক পরিবার। আগে কখনো ঘর খালি থাকত না। এখন কিছু কক্ষ ফাঁকা পড়ে আছে। ভাড়া ৫০০ টাকা কমিয়েও কাঙ্ক্ষিত ভাড়াটিয়া পাওয়া যাচ্ছে না।’
এ বিষয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের সাভার-আশুলিয়া ও ধামরাই শিল্পাঞ্চল কমিটির সাধারণ সম্পাদক আহমেদ জীবন বলেন, ‘এই শিল্পাঞ্চলে একটার পর একটা কারখানা বন্ধ হওয়ায় শ্রমিকরা চরম সংকটে পড়েছেন। অনেকে গ্রামে চলে গেছেন, অনেকে পেশা বদল করেছেন। আবার কাজ না পেয়ে কেউ কেউ বিপথেও যাচ্ছেন। এর থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। একইসঙ্গে কর্মহীন শ্রমিকদের নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।’
শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘আর্থিকসংকট, লে-অফ, কাজের অভাব ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাভার এবং আশুলিয়ায় ১৪১টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১২২টি কারখানা স্থায়ীভাবে ও ১৯টি অস্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে।’