ময়মনসিংহ নগরীতে সাম্প্রতিক সময়ে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। দিনে-রাতে দুই সময়েই ঘটছে এসব অপরাধ। প্রতিনিয়ত অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা, মোবাইল ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন গলি, নির্জন সড়ক ও জনশূন্য স্থানে এসব ঘটনার ঝুঁকি বেশি। এতে নগরবাসীর মধ্যে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা। বাসিন্দারা জানান, ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে অনেকে শুধু সম্পদই হারাচ্ছেন না, গুরুতর আহতও হচ্ছেন। কোথাও কোথাও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নগরীর ব্রহ্মপুত্র নদের চরে ঘুরতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ শাওন। ছিনতাইকারীদের ধাওয়া খেয়ে তিনি নদীতে ঝাঁপ দেন। দুই দিন নিখোঁজ থাকার পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এর কয়েক দিন পর ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে গাঙ্গিনারপাড় থেকে চরপাড়া যাওয়ার পথে অটোরিকশায় ছিনতাইয়ের শিকার হন কলেজছাত্র শোবাশশীর ইসলাম সাদ। যাত্রী সেজে অটোরিকশায় ওঠে চার ছিনতাইকারী। পরে ছুরি ঠেকিয়ে তার মানিব্যাগ ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয় তারা।
গত ২৩ জানুয়ারি ভোরে রেলওয়ে স্টেশনের দুই নম্বর গেট এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন হিমেল নামে এক ব্যবসায়ী। অটোরিকশায় স্টেশনে যাওয়ার পথে তার কাছ থেকে নগদ প্রায় দেড় লাখ টাকা ও তিনটি মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ জেলায় ১১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ২০টি ঘটনা ছিনতাই-সংশ্লিষ্ট। একই বছরে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬০টি। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৬৭ জনকে। তাদের মধ্যে ৩৬২ জনই নগরীর স্টেশন রোড, পুরোহিতপাড়া, সানকিপাড়া ও মীরবাড়ি এলাকার বাসিন্দা।
পুলিশের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পাঁচজন হত্যার শিকার হয়েছে। চুরির ঘটনা ঘটেছে আটটি। ফেব্রুয়ারিতে হত্যা সাতজন এবং চুরি আটটি। মার্চে হত্যা ১১ জন এবং চুরি ২২টি। এপ্রিল মাসে হত্যা সাতজন এবং চুরি ১৬টি। মে মাসে হত্যা আটজন এবং চুরি ৩০টি। জুনে হত্যা ১২ জন এবং চুরি ১৭টি।
জুলাইয়ে হত্যা ১৪ জন এবং চুরি ২৫টি। আগস্টে হত্যা নয়জন এবং চুরি ২২টি। সেপ্টেম্বরে হত্যা পাঁচ এবং চুরি ২৯টি। অক্টোবরে হত্যা হয়েছে সবচেয়ে বেশি ২০ জন এবং চুরি ২৬টি। নভেম্বরে হত্যা আটজন, চুরি ২৬টি। ডিসেম্বর মাসে হত্যা পাঁচজন এবং চুরি ২২টি।
বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজারের বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। শুধু কোতোয়ালি থানাতেই প্রতিদিন গড়ে আট থেকে ১০টি অভিযোগ জমা পড়ে। তবে অনেক ভুক্তভোগী আইনি জটিলতা বা সামাজিক হয়রানির ভয়ে থানায় অভিযোগ করেন না। গ্রেপ্তার হওয়া ছিনতাইকারীদের প্রায় ৯০ শতাংশই মাদকাসক্ত।
নগরীর শম্ভুগঞ্জ, ব্রিজ মোড়, কেওটখালী, বাকৃবি শেষ মোড়, সানকিপাড়া, মীরবাড়ি, কলেজ রোড, মাদ্রাসা কোয়ার্টার, কাশর রোড, বাইপাস মোড়, গাঙ্গিনারপাড়, স্টেশন রোড, পুরোহিতপাড়া, বাঘমারা, চরপাড়া, মাসকান্দা ও জয়নুল আবেদিন পার্ক এলাকা ছিনতাইয়ের ‘হটস্পট’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
নগরীর দক্ষিণপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. মাসুদ বলেন, ‘কয়েকদিন আগে সকালে ব্রিজ মোড় থেকে ঢাকা বাইপাসের একটি অটোরিকশায় উঠি। তখন আমার পাশে আরও দুজন ওঠে। কিছু সময় পর আমাকে অজ্ঞান করে অপহরণ করা হয়। পরে গাজীপুরের একটি বাসায় আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করে। মারধর করে আমাকে পরিবারের কাছে ফোন করতে বাধ্য করে। পরে অপহরণকারীদের সন্দেহ হয়, ঘটনাটি হয়তো পুলিশ জেনে গেছে। পরে আমাকে গাড়িতে তুলে মহাসড়কের পাশে ফেলে পালিয়ে যায়।’
আরেক ভুক্তভোগী কলেজছাত্র শোবাশশীর ইসলাম সাদ বলেন, ‘দিনের বেলায় অস্ত্রের মুখে আমার কাছ থেকে মানিব্যাগ ও মোবাইল নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনার পর থেকে আমি আতঙ্কিত।’
স্থানীয়রা বলছেন, পুলিশের টহল প্রধান সড়কে সীমাবদ্ধ থাকায় অলিগলি ও অন্ধকার স্থানে অপরাধীরা সুযোগ পাচ্ছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরাও অকেজো হয়ে আছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ জেলার সম্পাদক ইয়াজদানী কোরায়শী কাজল বলেন, ‘নগরীতে প্রতি মাসে গড়ে এক হাজারের বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। ঈদে ঘরবাড়ি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রেখে ছুটিতে যাওয়া নিয়ে আতঙ্কে আছেন নগরবাসী। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।’
এ বিষয়ে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ নিয়মিত টহল জোরদার করেছে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান চলছে।’ তিনি সন্দেহজনক কিছু দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর জন্য সবাইকে আহ্বান জানান।