কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে গরু চুরি। বিশেষ করে জেলার সদর, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ ও শাহজাদপুরে প্রায় প্রতি রাতেই হানা দিচ্ছে সংঘবদ্ধ চোর চক্র। অনেক প্রান্তিক খামারিরা নিঃস্ব হওয়ার ভয়ে লাইট, লাঠি আর বাঁশি হাতে রাত জেগে গোয়াল পাহারা দিচ্ছেন। গত দুই মাসে জেলা জুড়ে অর্ধশতাধিক গরু চুরির ঘটনা ঘটলেও এখনো কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন দ্রুত এই চক্রকে দমন করা না গেলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারে সিরাজগঞ্জের খামারিরা। তবে পুলিশ প্রশাসন বলছে, গরু চুরি বন্ধে তারাও বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বুধবার (১৯ মে) রাতে সিরাজগঞ্জর সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন মো. হাসান শেখের গোয়াল থেকে ছয়টি গরু চুরি হয়। এতে ওই গরুর মালিকের প্রায় ১৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী।
ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখের দীর্ঘদিন ধরে গরুগুলোকে লালন-পালন করছি। প্রতিদিনের মতো বুধবার রাতেও
গরুগুলো গোয়ালে বেঁধে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন। রাতের কোনো এক সময় সংঘবদ্ধ চোরচক্র বাড়ির বাইরে থেকে ঘরের ছিটকানি লাগিয়ে দেন, যাতে পরিবারের সদস্যরা বের হতে না পারেন এবং চোররা গরু নিয়ে পালিয়ে যান।
এ ছাড়া ১০ মে রাতে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার পূর্বরামকৃষ্ণপুর গ্রামের ময়নুল ইসলামের খামারে হানা দেয় একটি গরু চোরচক্র। সবার মুখে গামছা আর হাতে দেশিয় অস্ত্র। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, চক্রটি একে একে ছয়টি গরু নিয়ে যাচ্ছে।
আরও জানা যায়, গত ৫ মে গভীর রাতে কামারখন্দ উপজেলার বড়কুড়া মালোপাড়া, ছোট কুড়া ও নান্দিনা কামালিয়া গ্রামে এক রাতেই নয়টি গরু চুরির ঘটনা ঘটে। এরপর থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দা, খামারি, গ্রাম পুলিশ ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পালাক্রমে চলছে রাতভর পাহারা।
এদিকে, কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসতেই জেলাজুড়ে গরু চুরির ঘটনা এখন নিত্যদিনের। রাতের আঁধারে বিশেষ কায়দায় ট্রাকে করে গরু নিয়ে পালাচ্ছে চোরেরা। জেলা জুড়ে গরু চুরির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্ক বাড়ছে খামারিদের মধ্যে।
সদর উপজেলার ছয়টি গরু চুরির শিকার খামারি হাসান শেখ জানান, ঈদ উপলক্ষ্যে বিক্রির জন্য গরুগুলো প্রস্তুত করা হয়েছিল। এই গরুগুলো বিক্রি করেই সংসারের ঋণ পরিশোধ ও পরিবারের খরচ চালানোর পরিকল্পনা ছিল। এক রাতের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল। আমরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত গরুগুলো উদ্ধারের দাবি জানাচ্ছি।’
হাসান শেখের স্ত্রী চম্পা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ডাকাতরা আমাদের ঘরের ছিটকানি বাইরে থেকে লাগিয়ে রেখে গরুগুলো নিয়ে গেছে। আমরা কিছুই টের পাইনি। এখন আমরা পথে বসে গেছি।
গরু চুরির শিকার কামারখন্দের বড় কুড়া গ্রামের খামারি রুহুল আমিন জানান, তার খামারে দুটি গাভী, একটি বকনা গরু ও একটি কোরবানির ষাঁড় ছিল। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর ভোরে উঠে দেখেন খামারে একটি গরুও নেই।
তাড়াশ উপজেলার দোবিলা গ্রামের বাসিন্দা খামারি তোফাজ্জেল হেসেন ও আব্দুল মতিন বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও বাড়তি লাভের আশায় দেশি কয়েকটি গরু লালন-পালন করছি। চুরি হওয়ার ভয়ে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছি।
এদিকে গরু চুরি ঠেকাতে বাধ্য হয়ে প্রতি রাতেই দলবেঁধে হাতে বাঁশি, লাইট আর লাঠি নিয়ে পাহারা দিচ্ছে বিভিন্ন উপজেলার গ্রামের খামারিরা। তবে গরু চুরি রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি চোরচক্রকে ধরতে ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয়দের সহায়তায় কমিটি করে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. সাইফুল ইসলাম সানতু বলেন, গরু চুরি রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি চোর চক্রকে ধরতে ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয়দের সহায়তায় কমিটি গঠন ও বাঁশকল স্থাপন করে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখেই মূলত এ উদ্যোগ। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গ্রহণ করা এমন উদ্যোগে ইতোমধ্যে সুফল মিলতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের সক্রিয় অংশগ্রহণে গরু চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসবে।
কুরবানি ঈদকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জে বেড়েছে গরু চুরি, রাত জেগে পাহারায় খামারিরা
সিরাজুল ইসলাম/নাঈম