নীলফামারী সৈয়দপুরসহ উত্তরাঞ্চলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে। সৈয়দপুর সিটিগেট সঞ্চালন স্টেশন ও অন্যান্য কেন্দ্রের কাজ প্রায় সম্পন্ন। ডিসেম্বরে গ্যাস সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হবে। শিল্প-কারখানাগুলো দ্রুত গ্যাস পেলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং নতুন শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে।
নীলফামারীর সৈয়দপুরসহ উত্তরের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ। ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রতিশ্রুতি দেন এবং ২০২০ সালে বগুড়া-রংপুর-সৈয়দপুর পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পে ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন, তিনটি গ্যাস স্টেশন নির্মাণ এবং বিভিন্ন নদী-খাল ক্রসিংসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। মোট ব্যয় ছিল ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা, যা আগে নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে বেশি। ২০২৩ সালের শেষে গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, সৈয়দপুরের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো গ্যাস পাননি। তারা বাইরের উৎস থেকে গ্যাস কিনে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি পাইপলাইন কমিশনিংয়ের কাজ শেষ করেছে। এটি ভবিষ্যতে গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জিটিসিএল সৈয়দপুর সিটিগেট স্টেশনে রেগুলেটিং ও মিটারিংয়ের কাজ এবং পিজিসিএল সরবরাহ কেন্দ্রে ডিআরএস তৈরির কাজ চলছে। এতদিন কেন্দ্র দুটির অভ্যন্তর ফাঁকা থাকলেও বর্তমানে পুরো এলাকাজুড়ে গ্যাস সংশ্লিষ্ট দুটি কোম্পানির কাজের তৎপরতা লক্ষণীয়। কেন্দ্র দুটির পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে রয়েছে নানা মেশিনারিজ, খুচরা যন্ত্রাংশ ও অবকাঠামো নির্মাণের পণ্য সামগ্রী। রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের সরব পদচারণে। কবে নাগাদ এ অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও সৈয়দপুর সিটিগেট স্টেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের রেগুলেটিং এবং মিটারিংয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে। বাকিটা নির্ভর করছে ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ওপর।
স্থানীয়রা বলছেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। এ অঞ্চলের বিশাল এক জনগোষ্ঠী জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এতে করে বছরের বেশির ভাগ সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার থাকেন। এ অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠবে এবং তৈরি হবে মানুষের কর্মসংস্থান। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে। এতে করে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-মান অনেকটাই পাল্টে যাবে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা বলছেন, যত দ্রুত সম্ভব গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে গ্যাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কারণে এখানকার উৎপাদন খরচ অনেকাংশে কমে যাবে এবং নতুন উদ্যোক্তারা শিল্প খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে।
রানু এগ্রো অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুসান্ত কুমার বলেন, ‘৬ মাস ধরে আমরা ঢাকা থেকে এলপিজি গ্যাস ট্যাংক এনে শিল্পকারখানা চালিয়ে যাচ্ছি। এতে আমাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে উৎপাদন খরচ অনেক কমে যাবে।’
ইকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ সিদ্দিকুল আলম সিদ্দিক বলেন, ‘দ্রুত সময়ের মধ্যে শিল্পকারখানাগুলোকে গ্যাস দেওয়া সম্ভব হলে, অর্থনৈতিকভাবে এই অঞ্চল জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।’
গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) উপব্যবস্থাপক আহসান হাবিব বলেন, ‘সৈয়দপুর সিটিগেট গ্যাস সঞ্চালন কেন্দ্রের কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া লাইন কমিশনিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে এবং লাইনে গ্যাসপূর্ণ আছে। বর্তমানে রেগুলেটিং ও মিটারিংয়ের কাজ চলছে। ডিসেম্বরে গ্যাস সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হবে। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে গ্যাস দেওয়ার জন্য। এখান থেকে প্রতিদিন ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে।’
গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড এবং পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, চলতি মাসের ডিসেম্বর নাগাদ দুটি কেন্দ্রের কাজ শেষ হলে সরবরাহের কাজ শুরু হবে। সৈয়দপুর বিসিক কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ‘এই অঞ্চলের শিল্পকারখানার জন্য গ্যাস অত্যন্ত জরুরি। আমরা পিজিসিএলের কাছে গ্যাস লাইন সংযোগের জন্য চিঠি দিয়েছি, যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়।’