গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি। নারীর দক্ষতা উন্নয়ন, আয়মুখী কর্মকাণ্ড এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে পরিবার ও সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় গড়ে ওঠা ‘ঋ নকশা হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ এমনই একটি উদ্যোগ, যা স্থানীয় নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে নিচ্ছে। এই উদ্যোগের নেতৃত্বে রয়েছেন উদ্যোক্তা ও প্রশিক্ষক সাবেকুন্নাহার ঋতু।
২০১৮ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ব্লক প্রিন্ট, বাটিক ও হ্যান্ড অ্যামব্রয়ডারির কাজ দিয়ে যাত্রা শুরু করেন সাবেকুন্নাহার ঋতু। শুরুতে সীমিত পরিসরে কাজ করলেও ধীরে ধীরে স্থানীয় বাজারে তার কাজ পরিচিতি পেতে থাকে। স্থানীয় ক্রেতাদের ইতিবাচক সাড়া তাকে আরও বড় পরিসরে কাজ করার সাহস জোগায়।
দীর্ঘ প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতার পর ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘ঋ নকশা হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি স্থানীয় নারীদের কাছে প্রশিক্ষণ ও কাজের একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
ঋ নকশা হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ব্লক প্রিন্ট, বাটিক, সেলাই, হ্যান্ড অ্যামব্রয়ডারি, জুয়েলারি মেকিংসহ বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণার্থীরা এখানে শুধু কারিগরি দক্ষতা অর্জন করেন না তারা শেখেন পণ্য উৎপাদন, অর্ডার ব্যবস্থাপনা, মূল্য নির্ধারণ, বাজার বিশ্লেষণ এবং উদ্যোক্তা হওয়ার মৌলিক ধারণা।
প্রশিক্ষণ ও ব্যবসা মিলিয়ে মাস শেষে প্রতিষ্ঠানের আয় সাধারণত ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। ঈদ, পূজা ও উৎসব মৌসুমে অর্ডার বাড়লে আয় আরও বৃদ্ধি পায়। এই আয় শুধু উদ্যোক্তার নয়, কর্মীদের মধ্যেও কাজের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থনৈতিকভাবে এটি স্থানীয় নারীদের জন্য একটি বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করেছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
সাবেকুন্নাহার ঋতু একই সঙ্গে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ব্লক ও সেলাই প্রশিক্ষণের ট্রেনার হিসেবে কাজ করছেন। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি গ্রামাঞ্চলে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছেন। তার মতে, ‘হাতে-কলমে কাজ না শিখলে কোনো প্রশিক্ষণই কার্যকর হয় না। দক্ষতা থাকলে নারীরা ঘরে বসেই আয় করতে পারেন।’
প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সাবেকুন্নাহার ঋতু পরিচালনা করছেন হস্তশিল্পভিত্তিক পোশাক ও ফ্যাশন পণ্যের ব্যবসা। তার প্রতিষ্ঠানে তৈরি হয় ব্লক ও স্ক্রিন প্রিন্ট ডিজাইনের শাড়ি, পাঞ্জাবি, কুর্তি, থ্রিপিস ও শাল। পাশাপাশি হ্যান্ড পেইন্ট ও হ্যান্ড অ্যামব্রয়ডারি কাজ করা হয় বিভিন্ন পোশাকে, যা ক্রেতাদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে।
আধুনিক বাজারের চাহিদা বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করছে এমডিএফ বোর্ডের কাস্টমাইজড ব্যাগ, কাস্টমাইজড মিরর, ক্যানভাস আর্ট, রেজিন রিং-চুড়ি-ব্রেসলেট এবং জিপসাম শো-পিসসহ অনেক ধরনের ডেকোরেশন সামগ্রী।
স্থানীয় বাজার ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে গ্রামীণ হস্তশিল্প আধুনিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং নতুন ক্রেতা তৈরি হচ্ছে।
বর্তমানে ঋ নকশা হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১৭ জন নারী কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে ৩ জন প্রশিক্ষক এবং ১৪ জন দক্ষ কর্মী সেলাই, হ্যান্ড পেইন্ট ও হ্যান্ড অ্যামব্রয়ডারি কাজে যুক্ত।
এই কর্মীরা সবাই একসময় এখানকার প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন। ভালো পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে তাদের দিয়ে অর্ডারভিত্তিক কাজ করানো হয়। বিশেষ করে যাদের পারিবারিক বা আর্থিক সমস্যা রয়েছে, তাদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা হয় এবং পরে অর্ডারভিত্তিক কাজ দিয়ে আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।
ঋ নকশা হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ইতোমধ্যে ২৬০ জনের বেশি নারী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পটিয়া, শান্তির হাট, বোয়ালখালী, বাদামতলসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা এখানে প্রশিক্ষণ নিতে আসেন।
এ ছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, ইসফা, কারিতাস ও বনফুলসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ৪০০ জনের বেশি নারী ও কিছু পুরুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন সাবেকুন্নাহার ঋতু। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অনেকেই বর্তমানে নিজস্ব ছোট ব্যবসা পরিচালনা করছেন অথবা ঘরে বসে অর্ডারভিত্তিক কাজ করে সংসারের আয় বাড়াচ্ছেন।
স্থানীয় পর্যায়ে নারীর দক্ষতা উন্নয়ন, আয়মুখী কর্মকাণ্ড ও উদ্যোক্তা তৈরি- এই তিন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। অনেক প্রশিক্ষণার্থী পরিবারের আর্থিক সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছেন, কেউ পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন, কেউ নিজস্ব উদ্যোগে ছোট ব্যবসা শুরু করেছেন।
সাবেকুন্নাহার ঋতু জানান, ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, ডিজিটাল মার্কেটিং শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে হস্তশিল্প পণ্য রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে। তার লক্ষ্য, আরও বেশি নারীকে প্রশিক্ষণের আওতায় এনে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং হস্তশিল্প খাতকে একটি টেকসই শিল্প খাতে রূপান্তর করা।