অবশেষে চলে গেলেন শরিফ ওসমান হাদি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। প্রাণোচ্ছল এই তরুণ হয়ে উঠেছিলেন দ্রোহের প্রতীক। বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে তারুণ্যের প্রতিনিধি হিসেবে খুব অল্পসময়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
যেকোনো প্রতিভাবান তরুণের অকালমৃত্যু অপূরণীয় এক ক্ষতি– সম্ভাবনার অপমৃত্যু, অপমৃত্যু স্বপ্নের, অপমৃত্যু উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। সুবক্তা এবং সংগঠক ছিলেন হাদি। নেতৃত্ব দেওয়ার সহজাত গুণ ছিল তার।
হাদির উত্থান ঘটেছিল গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। আন্দোলনের খুব পরিচিত মুখ ছিলেন না তখন, কিন্তু সামনের সারিতে ছিলেন। পরে সভা, টকশোর সূত্রে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি অর্জন করেন। প্রচলিত নানামুখি ছাত্ররাজনীতির বাইরে নিজের একটা ধারা তৈরি করতে সচেষ্ট ছিলেন হাদি। সফলও হয়েছিলেন অনেকখানি। জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন হাদি। তিনি জুলাই শহিদদের অধিকার রক্ষা এবং আধিপত্যবাদবিরোধী সক্রিয় রাজনীতির জন্য আলোচনায় আসেন।
জুলাই চেতনার সঙ্গে একাত্ম হলেও কোনো কোনো বিষয়ে দ্বিমতও প্রকাশ করেছেন। টকশোতে তিনি যেসব কথা বলতেন, তা থেকেই প্রকাশ পাচ্ছিল। আরেকটি গুণ ছিল তার। চমৎকার কবিতা আবৃত্তি করতেন। তার আবৃত্তি করা ‘বিদ্রোহী’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে আছে। তরুণ নেতার এসব লক্ষণই তাকে পরিচিত করে তুলছিল। কিন্তু তার লক্ষ ছিল আরও বড়ো। জাতীয় নেতা হয়ে উঠার জন্য আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের তিনি ছিলেন একজন সম্ভাব্য প্রার্থী। সেই লক্ষ্যে গণসংযোগও করছিলেন। কিন্তু সেটাই হাদির জন্য কাল হলো। তিনি গুলিবিদ্ধ হলেন এবং পরিশেষে মৃত্যুবরণ করেন। আমরা তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি এবং তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানাই।
রাজনীতি সবসময় তারুণ্যের প্রাণপ্রবাহে সমৃদ্ধ হয়। হাদিও আমাদের রাজনীতিকে সমৃদ্ধ করছিলেন। তার চিন্তা, যুক্তিশীলতা, আবেগ–একজন তরুণ রাজনীতিকের যেসব গুণ থাকতে হয়, সবই ছিল তার। হাদি সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলি, হাদি শুধু প্রতিবাদ নয়, দেশপ্রেম, ধৈর্য ও দৃঢ়তার অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে অবিচল ছিলেন এই অকুতোভয় তরুণ।
হাদির মৃত্যুর পর দেশে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এ রকম সময়ে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেমন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন– আমাদের হঠকারী হয়ে ধৈর্য হারালে হবে না, সংযম বজায় রাখতে হবে। প্রতিটি নাগরিককে আইনি শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে সহায়তা করতে হবে। প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকসহ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে যে হামলা হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও বলেছেন, ছায়ানটের হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সচেতন নাগরিক সমাজ থেকেও এই দাবি উঠেছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এসব হামলার বিরুদ্ধে সরকারের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এ রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেদিকেও সরকারকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
তারুণ্য যেমন শক্তি, তেমনি তারুণ্যের অপচয় কাম্য নয়। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে তরুণরা উঠে এসেছেন, তাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। এই পৃষ্ঠপোষকতা শুধু পুনর্বাসন নয়, এর সঙ্গে প্রয়োজন দেশপ্রেমের বোধে তাদের দিকনির্দেশনা দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। এই প্রস্তুতিতে রাষ্ট্র বড়ো ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশের সর্বজনীন সংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিকতার দিকগুলোর দ্বারা তাদের দীক্ষিত করা জরুরি। এসব বৈশিষ্ট্য ধারণ করে একজন তরুণ যাতে একই সঙ্গে দেশপ্রেম ও বিশ্বাত্মবোধে উত্তীর্ণ হতে পারেন, সেই লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে রাষ্ট্র। কিন্তু এখন পর্যন্ত এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের পরিকল্পনা কী, তা সামনে আসেনি। ব্যাপক পরিসরে এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে আমাদের তারুণ্য আরও সৃষ্টিশীল এবং নানা ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারবে। হাদির মৃত্যু সেই বোধের দিকেও নতুন করে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে। তার স্বপ্ন পূরণে কাজ করতে হবে।