ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আজ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সংবিধান অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের বৈঠক আহ্বান করতে হয়। আজ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সেই ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন।
নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। সংসদে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি। এই ভাষণের ওপর অধিবেশনে আলোচনা করবেন সংসদ সদস্যরা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো প্রথম বৈঠকে উত্থাপন করা হবে। এভাবেই শুরু হবে নতুন সরকারের সংসদীয় যাত্রা। সেই সঙ্গে বাংলাদেশও নিয়মতান্ত্রিক শাসনের ধারায় ফিরে আসবে। গত দেড় বছরে দেশের শাসনব্যবস্থাকে ঘিরে যে অনিশ্চয়তা ছিল, নির্বাচিত সরকারের হাতে দেশের শাসনভার অর্পিত হওয়ায় সেই অনিশ্চয়তা দূর হলো।
বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের ইতিহাস একেবারেই মসৃণ নয়। নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তা এগিয়েছে। প্রথম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে। সেই নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর ছয় মাস। দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালে। সেই সংসদের মেয়াদ ছিল তিন বছর। তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে জাতীয় পার্টি। সংসদের মেয়াদ ছিল ১৭ মাস। চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে জাতীয় পার্টি। সরকারের মেয়াদ ছিল দুই বছর সাত মাস। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। সেই সংসদের মেয়াদ ছিল চার বছর আট মাস। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে। সেই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে সেই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১১ দিন। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের জুনে, সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। অষ্টম জাতীয় সংসদে বিএনপি-জামায়াত জোট নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে সেই সরকার পূর্ণ পাঁচ বছর দেশ শাসন করে।
এরপর নবম, দশম, একাদশ জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়ে পূর্ণ মেয়াদে শাসন করেছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জয়ী হয় আওয়ামী লীগ, কিন্তু সেই সরকারের স্থায়িত্ব ছিল ছয় মাস সাত দিন। দশম থেকে দ্বাদশ সংসদীয় নির্বাচন নানা কারণে, বিশেষ করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় বিতর্কিত হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। যদিও এই নির্বাচনে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে পারেনি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তার মিত্ররা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারি’-এর অভিযোগ তুলেছে, তবু তারা নির্বাচন বর্জন করেনি কিংবা সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেনি। ফলে বাংলাদেশ আবার সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রবেশ করল। এই নির্বাচনে জয়ী সব সংসদ সদস্যকে আমরা অভিনন্দিত করছি।
সংসদীয় ব্যবস্থার যে রীতি, আশা করব এবার সেভাবে সংসদ পরিচালিত হবে। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় গণতন্ত্রের অপরিহার্য দুটি স্তম্ভ হচ্ছে সরকার ও বিরোধী দল। এই ব্যবস্থায় সরকারের দায়িত্ব নীতিনির্ধারণ, বাস্তবায়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করা। অন্যদিকে বিরোধী দল সরকারের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুশাসন ও ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখে। উভয়েরই লক্ষ্য থাকে জনস্বার্থ রক্ষা এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা অক্ষুণ্ন রেখে অগ্রগতির পথে নিয়ে যাওয়া। অনেকে বিরোধী দলকে ছায়া সরকার বলেও অভিহিত করে থাকেন। বিরোধী দল যেমন বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করা নয়, তেমনি সরকারি দলকেও সংসদে যাতে বিরোধী ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কণ্ঠস্বর যথাযথ স্থান পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিরোধী দল জামায়াত এবং তার মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করবে। সংসদের শুরুতেই বর্জনের এই প্রবণতা আমাদের শঙ্কিত করে তুলছে। সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম এবং বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিয়ে থাকেন। সাংবিধানিক এই রীতি সব সংসদ সদস্যের মান্য করা গণতন্ত্রের স্বার্থেই জরুরি। সরকারি, বিরোধী ও স্বতন্ত্র সদস্যদের গঠনমূলক, প্রাণবন্ত, কার্যকর বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হোক। সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হোক সংসদ, এটাই প্রত্যাশা।