চতুর্থ অধ্যায় : প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (৩২৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ)
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর-২
উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
গুপ্ত রাজাদের অধীনে বড় কোনো অঞ্চলের শাসনকর্তাকে বলা হতো 'মহাসামন্ত'। শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত রাজা মহাসেন গুপ্তের একজন মহাসামন্ত। একজন চৈনিক পরিব্রাজক তাকে বৌদ্ধ ধর্ম বিদ্বেষী বলে আখ্যায়িত করেন। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে তিনিই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম শাসক।
ক) খড়গ বংশের রাজধানী কোথায় ছিল? ১
খ) সেনদের ব্রহ্মক্ষত্রিয় বলা হয় কেন? ২
গ) উদ্দীপকে কোন রাজার কথা উল্লেখ করা হয়েছে? ব্যাখ্যা করো। ৩
ঘ) ‘প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে তিনিই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম শাসক’ উক্তিটির যথার্থতা নিরূপণ করো। ৪
উত্তর: ক) খড়গ বংশের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। এটি প্রাচীন বাংলার গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার অন্তর্গত বলে ধারণা করা হয়।
খ) সেন রাজারা নিজেদের ব্রহ্মক্ষত্রিয় (ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় গুণসম্পন্ন) বলে অভিহিত করতেন কারণ তারা মূলত ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূত হলেও পরবর্তী সময়ে ক্ষত্রিয় গুণ অর্জন করেছিলেন। সেন রাজাদের দাবি ছিল যে তারা ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে এসেছেন কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিজেদের ক্ষত্রিয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই কারণে তাদের ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় গুণের মিশ্রণে ব্রহ্মক্ষত্রিয় বলা হয়।
গ) উদ্দীপকে যে রাজার কথা বলা হয়েছে, তিনি হলেন শশাঙ্ক। শশাঙ্ক ছিলেন প্রাচীন বাংলার গৌড় রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সার্বভৌম শাসক। গুপ্ত সাম্রাজ্যের অবসানের পর বাংলায় ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি হয়, যা শশাঙ্কের ক্ষমতায় আসার পূর্ববর্তী সময় মাৎস্যন্যায় নামে পরিচিত ছিল। শশাঙ্ক গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনস্থ এক সামন্ত হিসেবে শাসনকার্য শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি স্বাধীন গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাংলার একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যে রূপান্তর করেন।
শশাঙ্কের ক্ষমতা অর্জন ও শাসন প্রতিষ্ঠা: শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের একজন সামন্তপ্রধান, কিন্তু গুপ্ত সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তিনি স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হন এবং নিজের গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। শশাঙ্কের শাসন প্রতিষ্ঠা বাংলার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা, কারণ তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি বাংলা অঞ্চলে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা তৈরি করেন। শশাঙ্কের রাজ্য কর্ণসুবর্ণে অবস্থিত ছিল এবং এটি তার রাজধানী হিসেবে পরিচিত।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও বৌদ্ধধর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাব: শশাঙ্কের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং বৌদ্ধধর্মের প্রতি তার বিরূপ মনোভাব তাকে প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে বিতর্কিত শাসকে পরিণত করে। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের বিবরণ অনুযায়ী, শশাঙ্ক বৌদ্ধধর্মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার সময়কালে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের চর্চা বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং শশাঙ্ক হিন্দু ধর্মের প্রসারে কাজ করেন।
আরো পড়ুন : প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস অধ্যায়ের ১টি সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর
শাসনব্যবস্থা ও সামরিক দক্ষতা: শশাঙ্ক ছিলেন একজন দক্ষ শাসক এবং সামরিক নেতাও। তিনি বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে সামরিক সংঘর্ষে লিপ্ত হন এবং নিজের রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানা সম্প্রসারণ করেন। তার শাসনামলে গৌড় রাজ্য এক শক্তিশালী ও সুসংগঠিত রাজ্যে পরিণত হয়। শশাঙ্কের শাসনব্যবস্থা বাংলার জন্য এক নতুন যুগের সূচনা করে। বাংলা রাজ্যটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অগ্রসর হয়।
উদ্দীপকে উল্লিখিত রাজার বর্ণনার সঙ্গে শশাঙ্কের জীবন ও কর্মের বিশদ বিবরণ মিলে যায়। শশাঙ্কই ছিলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন সার্বভৌম শাসক, যিনি গৌড় রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। তার শাসনকাল বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে এবং পরবর্তীতে বাংলার অন্য শাসকদের জন্য তা শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে।
ঘ) শশাঙ্ককে বাংলার ইতিহাসে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম শাসক হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এই দাবির যথার্থতা রয়েছে। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর বাংলায় প্রথম সার্বভৌম শাসক হিসেবে শশাঙ্কের আবির্ভাব হয়। তিনি একটি সুসংগঠিত রাজ্য তৈরি করেন, যা পরে বাংলাকে শক্তিশালী রাজ্য হিসেবে ভিত্তি স্থাপনে সহায়তা করে। শশাঙ্ককে বাংলার ইতিহাসে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম শাসক উক্তিটির যথার্থতা নিচে আলোচনা করা হলো-
১. স্বাধীন গৌড় রাজ্যের প্রতিষ্ঠা: শশাঙ্ক গৌড় রাজ্যের স্বাধীন শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং এটি ছিল বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজ্য। তিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনস্থ সামন্ত থেকে নিজের স্বাধীন রাজ্য গঠন করেন এবং নিজের ক্ষমতা প্রভাবিত করেন। বাংলার ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, কারণ এর আগে বাংলার রাজ্যগুলো বিভিন্ন সামন্তের অধীনে বিভক্ত ছিল এবং এককভাবে বাংলা অঞ্চলকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য হিসেবে পরিচালনার মতো শক্তিশালী কোনো শাসক ছিল না।
২. সামরিক ক্ষমতা ও ভূখণ্ডের সম্প্রসারণ: শশাঙ্ক সামরিক কৌশলে দক্ষ ছিলেন এবং তার শাসনামলে গৌড় রাজ্য মগধ ও বঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রসারিত হয়। তিনি বিভিন্ন রাজ্যের শাসকদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন এবং নিজের সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করে তোলেন। এটি বাংলাকে প্রথমবারের মতো একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করে এবং অন্যান্য ভারতীয় রাজ্যের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
৩. ধর্মীয় নীতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা: শশাঙ্ক হিন্দু ধর্মের অনুসারী ছিলেন এবং তার শাসনামলে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়। যদিও এই কারণে তাকে ধর্মীয় ক্ষেত্রে কঠোর বলে আখ্যায়িত করা হয়, তবে তার ধর্মীয় ও প্রশাসনিক নীতি বাংলার স্থিতিশীলতা আনায়ন করেছিল ও ঐতিহ্য গড়ে তুলেছিল। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ তার শাসনকাল সম্পর্কে কিছু বিতর্কিত তথ্য দিলেও শশাঙ্কের প্রশাসন বাংলা অঞ্চলে শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনে সক্ষম হয়।
৪. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি: শশাঙ্কের শাসনামলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং বাংলা একটি সংগঠিত ও শক্তিশালী রাজ্যে রূপান্তরিত হয়। বাংলার ইতিহাসে এটি প্রথমবারের মতো ঘটে এবং শশাঙ্কের এই অবদান পরবর্তীতে পাল ও সেন রাজাদের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
৫. বাংলার ঐতিহাসিক প্রভাব: শশাঙ্কের শাসনামলে বাংলার রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। তার সময়েই প্রথমবারের মতো বাংলা একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের স্বীকৃতি পায়, যা পরবর্তী সময়ে ভারতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে ছিল। শশাঙ্কের শাসনব্যবস্থা বাংলা অঞ্চলকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করে এবং বাংলার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তৈরি করে।
তাই একথা নি:সন্দেহে বলা যায় যে, ‘প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে তিনিই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম শাসক’ এই উক্তিটি শশাঙ্কের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে যথার্থ। তার শাসনকালে বাংলায় স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সংগঠিত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। শশাঙ্কের নেতৃত্বে বাংলায় যে শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, তা পরবর্তীতে পাল ও সেন রাজাদের শাসনের জন্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে এবং বাংলাকে একটি সুসংগঠিত শাসনব্যবস্থায় উন্নীত করে।
লেখক : সহকারী শিক্ষক
সাভার অধরচন্দ্র সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
কবীর