ঢাকা ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বাজেট অধিবেশন বসছে আজ দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ জনগণের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা: সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী দৌলতদিয়া ফেরিতে বাস দুর্ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩ শরীয়তপুরে আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিল মধুখালীতে জাল সনদে মাদরাসায় চাকরির অভিযোগ তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর গাইবান্ধায় ট্রেন থেকে পড়ে পা বিচ্ছিন্ন হওয়া সেই যুবকের মৃত্যু দৈনিক খবরের কাগজের শাকিলা ববিসহ সিলেটের ৬ সাংবাদিকে প্রেস লিগেসি অ্যাওয়ার্ড প্রদান নড়াইলে বাস উল্টে আহত ১৫ দক্ষিণ এশিয়ার মুকুট হারাল বাংলাদেশ নড়াইলে পৃথক স্থানে বজ্রপাতে নিহত ২ সরু একটি আইলই এখন তাদের আশ্রয়স্থল ১২০০ ফুট লম্বা পতাকা নিয়ে ব্রাজিল সমর্থকদের র‍্যালি কুমিল্লায় বাসের ধাক্কায় অটোরিকশার ৩ যাত্রী নিহত শহিদ জিয়ার প্রস্তাবে যুদ্ধের নাম হয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অথচ বাজেট বরাদ্দ তলানিতে ঢাকায় শুরু হচ্ছে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী অধস্তনকে চড় মারায় সিলেটের এক নির্বাচন কর্মকর্তাকে লঘু দণ্ড তীব্র অর্থনৈতিক মন্দায় দেশ, দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা জাপা চেয়ারম্যানের দেশীয় প্রযুক্তিতে অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করবে সরকার আরেকবার সাফের ফাইনালে ঋতুপর্ণার গোল দৌলতদিয়ায় বাস নদীতে পড়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩ শরীয়তপুরে মাটির নিচ থেকে উঠছে ধোঁয়া, এলাকায় চাঞ্চল্য চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ সংগঠনের ১৩ জন গ্রেপ্তার দৌলতদিয়ায় বাস নদীতে পড়ার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ৩ এক টুকরো হৃদয়ের নাম বাংলাদেশ রামিসার  মামলার  দ্রুত রায় মা হচ্ছেন সোহিনী গাজায় ৪৮ ঘণ্টায় নিহত পাঁচজন চামড়া নিয়ে দুর্ভোগ আর দুর্গতির শেষ কোথায়
Nagad desktop

জুলাই আন্দোলনে কেমন ছিল অপতথ্যের প্রবাহ?

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৫৬ পিএম
জুলাই আন্দোলনে কেমন ছিল অপতথ্যের প্রবাহ?
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

৫ আগস্ট ২০২৪। সকাল গড়িয়ে দুপুর আসন্ন। চলছিল ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। রাজপথে মানুষের জমায়েত বাড়ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে ছড়িয়ে পড়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর। রিউমর স্ক্যানারের কাছে এ সংক্রান্ত একটি ছবি আসে যেখানে দেখা যায়, উড়ার অপেক্ষা থাকা একটি হেলিকপ্টারের সামনে কিছু লাগেজ এবং দুটি গাড়ি। কিছু মানুষের সঙ্গে সেখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় থাকা এসএসএফ সদস্যদেরও দেখা যাচ্ছিল। 

বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্র জানাচ্ছিল, শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ত্যাগ করেছেন। দুপুর তিনটার কিছু পরে রিউমর স্ক্যানারও নিশ্চিত হয়, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটেছে ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের। দেশ ছেড়েছেন শেখ হাসিনা। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবির পথ ধরে সংঘর্ষ, হামলা আর শত শত মৃত্যুর একেকটা দিন পেরিয়ে এক দফার দাবিতে এসে স্থির হওয়া এই আন্দোলন যখন পরিণতি পেল, তখন পেছন ফিরে দেখা গেল, আন্দোলনের প্রতিটি দিন অপতথ্যও ছিল নীরব সঙ্গী। সেই দিনগুলোয় এসব অপতথ্য মোকাবিলায় নিরলস কাজ করে গেছে রিউমর স্ক্যানার।

আন্দোলনের দিনগুলোয় দেড় শতাধিক অপতথ্য 

কোটা সংস্কারের দাবিতে গেল বছর আন্দোলন শুরু হয় ৫ জুন। জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে সংগঠিত হয় এবং সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল করে ২০১৮ সালের সরকারি বিজ্ঞপ্তি পুনর্বহালের দাবিতে টিএসসিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। এরপর আন্দোলনকারীরা দাবি পূরণের জন্য ৪ জুলাই সময়সীমা নির্ধারণ করে। কিন্তু সেদিন আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেনি যা কি-না কোটা বাতিলের ২০১৮ সালের সার্কুলারকে অবৈধ করে দেয়। ফলে শিক্ষার্থীরা সারা দেশে তাদের বিক্ষোভ আরও তীব্র করে। ঠিক সেদিনই এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রথম একটি অপতথ্য প্রচার হতে দেখে রিউমর স্ক্যানার। একটি ডিজিটাল ব্যানারের মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছিল ‘এই কোটা আন্দোলন আমাকে ফেসবুক ইউটিউবে লাখ লাখ ফলোয়ারস দিয়েছে। চাইলে আমি যেকোনো সময়ে বিকাশ/নগদের মাধ্যমে আয় করতে পারছি। তাই আমার চাকরিতে যাওয়ার ইচ্ছা জাগেনি।’ শীর্ষক মন্তব্যটি ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান করেছেন।

তবে রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখে, রাশেদ খান এমন কোনো মন্তব্য করেননি। 

বিক্ষোভ চলতে থাকে পরের দিনগুলোতেও। ১১ জুলাই খবর আসে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করতে যাওয়ার পথে পুলিশের বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। আহত হন শিক্ষার্থীসহ অন্তত ২০ জন। সেদিনই প্রথম এই আন্দোলনে মৃত্যুর গুজব প্রচার হয়। ১৫ জুলাই পর্যন্ত আন্দোলনে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শহিদ হন, যা এই আন্দোলনে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা। সেদিন দ্বিতীয় শহিদ দাবিতে রংপুরের আরেক শিক্ষার্থীর ছবি প্রচার করা হয়। মিফতাহুল জান্নাত মিতা নামে এই শিক্ষার্থীর বড় বোন রিউমর স্ক্যানারকে জানান, মিতা আহত হলেও পরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। 

১৬ জুলাইয়ের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকার দলীয় নেতা-কর্মীরা আন্দোলনে আরও বাধা হয়ে আসলে এই লড়াই সহিংসতায় রূপ নেয়। এতে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটে, আহত হন হাজার হাজার মানুষ। দিনগুলোতে অপতথ্যের প্রবাহও ছিল নিত্য সঙ্গী। ১৫ জুলাই থেকে সে মাসের বাকি প্রতিটি দিনই অপতথ্যের প্রবাহ দেখা গেছে। এমনকি ৫ আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনার পতনের পূর্ব সময় পর্যন্তও এই আন্দোলন নিয়ে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। টানা আন্দোলনের এই ৩৬ দিনে ১৫৪টি অপতথ্য শনাক্ত করে রিউমর স্ক্যানার। 

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি (১৭টি) অপতথ্য ছড়ায় ১৮ জুলাই। সেদিন সম্পূর্ণ ‘শাটডাউন’ কর্মসূচির প্রেক্ষিতে ঢাকাসহ ৪৮টি জেলায় বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, পুলিশের গুলি ও হামলার ঘটনা ঘটে। শহিদ হন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ অন্তত ৪২ জন। শেখ হাসিনার পদত্যাগের আগের তিন দিনও অপতথ্যের ব্যাপক প্রচার ছিল। ২ আগস্ট শুক্রবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জুমার নামাজের পর ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচি পালিত হয় অন্তত ২৮ জেলায়। পরদিন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে জমায়েত হন শিক্ষার্থীসহ হাজারো জনতা। ৪ আগস্ট একই দাবিতে সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি শুরু হয়। এই তিন দিনেই ৪৩টি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।  

সময়ে সময়ে বদলেছে অপতথ্যের ধরণ

জুলাইয়ের আন্দোলনে অপতথ্যের ধরণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। শুরুর দিকে বিক্ষোভ, অবরোধ এবং ক্লাস বর্জনের মতো ঘটনাগুলোয় অপতথ্যের প্রবাহ দেখা যায়নি। ১১ জুলাই যখন আন্দোলন সহিংস রূপ নিতে শুরু করে তখন থেকে মৃত্যুর ভুয়া দাবি আসতে থাকে। ১৫ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়। বিশেষ করে নিজের চীন সফর নিয়ে ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়। এর প্রেক্ষিতে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। রাস্তায় নেমে আসেন শিক্ষার্থীরা। পরদিন দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও বিভিন্ন মাধ্যমে সর্বমোট ১৩ জনের মৃত্যুর ভুয়া দাবি প্রচার করা হয়। এই আন্দোলনে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ১৬ জুলাই। এরপর প্রায় প্রতিদিনই মৃত্যুর খবর এসেছে গণমাধ্যমে। মৃত্যুর বাস্তব ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর মৃত্যু সংক্রান্ত ভুয়া দাবিগুলো কমতে শুরু করে। ১৬ জুলাই পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের মৃত্যুর দাবি প্রচার হলেও পরের দিনগুলোয় তৎকালীন সরকার পক্ষের ব্যক্তিদেরও মৃত্যুর ভুয়া দাবি ছড়াতে দেখা গেছে। ১৬ জুলাইতেই অন্তত দুজন ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যুর দাবি আসে রিউমর স্ক্যানারের কাছে। যাচাই করে দেখা যায়, দুটো দাবিই ভুয়া।

১৬ জুলাই একটি বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে কিছু ব্যক্তিদের ফেলে দেওয়ার একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয় যেটি ব্যবহার করে দাবি করা হয়, বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে শিক্ষার্থীদের ফেলে দিচ্ছে ছাত্রলীগ। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, চট্টগ্রামে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী পরিচয়ধারীদের কর্তৃক ছাত্রলীগের কর্মীদের ভবনের ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য ছিল এটি।

আগের দিন ঢাবিতে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনার প্রেক্ষিতে এক নারী শিক্ষার্থীর ছবি ভাইরাল হয় ফেসবুকে। দাবি করা হচ্ছিল, তিনি নিহত হয়েছেন। তবে রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখে, সানজিদা আহমেদ তন্নি নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী সহিংসতায় আহত হলেও পরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

মৃত্যুর এমন ভুয়া দাবিগুলোর মধ্যে গণমাধ্যমকে জড়িয়ে মৃত্যুর সম্মিলিত সংখ্যা নিয়ে ভুয়া দাবিও ছড়িয়েছে। 

১৬ জুলাই নারীদের ধর্ষণ সংক্রান্ত অন্তত দুটি দাবি প্রচার হতে দেখা যায়। কোনো কোনো ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়, ঢাবির রোকেয়া হলে ২৭ জন নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। আবার কোনো পোস্টে একই দাবির ঘটনা রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বলে উল্লেখ করা হয়। আদতে এমন কিছুই ঘটেনি। একইদিন ‘সঞ্চিতা পাল দেবী’ নামের একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টের ভিত্তিতে তাকে ছাত্রলীগের কথিত নেত্রী পরিচয় দিয়ে তিনি কোটা আন্দোলনরত ছাত্রীদের প্রকাশ্যে গণধর্ষণের হুমকি দিয়েছেন শীর্ষক দাবিও প্রচার করা হয়। আগস্টে ছাত্রলীগ নেত্রী আতিকা বিনতে হোসাইনের নামে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ক্রমাগত অশ্লীল কনটেন্ট পোস্ট করা হয়। 

১৭ জুলাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের কক্ষ ভাঙচুর করে শিক্ষার্থীরা। এরই প্রেক্ষিতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের শিক্ষার্থীদের কক্ষ থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার দাবিতে একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আদতে এসব অস্ত্র ও মদের বোতল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। 

১৮ জুলাই ছাত্রলীগ নেত্রীর করুণ অবস্থার দৃশ্য দাবিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মৌন প্রতিবাদমূলক নাটকে অভিনয়ের পুরোনো ভিডিও প্রচার করা হয়। এই ভিডিও দিয়ে চলতি বছরও ভুয়া দাবি প্রচার করা হয়েছে। এমন অপতথ্যের পরিমাণ ক্রমশই বাড়ছিল। ছিল ভিত্তিহীন দাবির প্রচারও। যেমন, ২৭ জুলাই প্রচার করা হয়, কোটা আন্দোলনে ছয় নেতা আটকের সময় তাদের হোটেল কক্ষ থেকে ৪৫ লাখ টাকা ও ৯টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। অথচ এমন কিছুই ঘটেনি। অপপ্রচার চলেছে অভ্যুত্থানের আগের দিনও। ৪ আগস্ট মধ্যরাত থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সে সময়ের সমন্বয়ক সারজিস আলমের নামে দুটি গণমাধ্যমের আদলে তৈরি ফটোকার্ড ব্যবহার করে দাবি করা হয়, সারজিসের বাসা থেকে দুই কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখে, ফটোকার্ড দুটিই ভুয়া। 

এই আন্দোলনে তৎকালীন সরকার এবং আন্দোলনকারীদের বাইরে রাজনৈতিক বিভিন্ন দল নিয়েও অপতথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। ১৭ জুলাই বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কোটাবিরোধী আন্দোলনের বিষয়ে নওমি নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনালাপ শীর্ষক দাবিতে ২০১৮ সালের একটি কথিত অডিও ক্লিপ প্রচার করা হয়। ১৮ জুলাই ফেসবুকে একাধিক ডিজিটাল ব্যানার পোস্ট করে দাবি করা হয়, নারী কোটা বাতিলসহ চাকরিতে নারীদের প্রত্যাহার ও মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা চেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আদতে দলটির পক্ষ থেকে এমন কোনো দাবিই করা হয়নি। 

জুলাইজুড়ে অপতথ্যের প্রচারে ব্যবহার হতে দেখা যায় বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব এবং ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ফুটেজও। ১৭ জুলাই ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়, আন্দোলন ইস্যুতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ড ও বলিউড অভিনেতা ইমরান হাশমি ফেসবুকে এবং ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি এক্সে পোস্ট করেছেন। তবে দাবিগুলো ছিল ভুয়া। 

১৮ জুলাই একাধিক পোস্টে দাবি করা হয়, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আন্দোলনকেন্দ্রিক সহিংস পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বাংলাদেশ সরকারকে ইউনেস্কোর তরফ থেকে বহিষ্কার করা হবে। অথচ এমন কোনো ঘোষণাই আসেনি সংস্থাটির পক্ষ থেকে। ১৮ জুলাই একটি ভিডিও দিয়ে দাবি করা হয়, বিদেশি নারী সংবাদ উপস্থাপিকা কোটা সংস্কার আন্দোলনের সংঘাতের ভিডিও দেখে কেঁদেছেন। রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যাওয়া এই ভিডিও যাচাই করে দেখা যায়, ২০১৯ সালে সিরিয়ার একটি সংবাদ পাঠের সময় পাঠিকার কান্নার দৃশ্যের ভিডিও এটি। 

২৭ জুলাই দাবি করা হয়, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সমর্থন করে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো তার এক্স অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেছেন। রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখে, আলেসান্দ্রোর নামে চালু থাকা ভুয়া এক্স অ্যাকাউন্টের পোস্টকে রাষ্ট্রদূতের আসল পোস্ট দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। ২৫ জুলাই একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়, পাকিস্তানিরা কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে মিছিল করেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিডিওটি ২০২২ সালের ভিন্ন ঘটনার।

প্রশাসনের ব্যক্তিদের নিয়েও এই আন্দোলনে অপতথ্যের প্রচার ছিল। ৩০ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়, সেদিন সরকার ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোক পালনে অস্বীকৃতি জানায় ১০০ জন সরকারি কর্মকর্তা। মূলত, ভিত্তিহীনভাবে ভুয়া দাবিটি ছড়িয়েছিল। 

কয়েক সপ্তাহের এই বিক্ষোভ আগস্টে গিয়ে আরও জনমুখী আন্দোলনে রূপ নেয়। এ সময় নির্দিষ্ট কোনো ধরনে আটকে ছিল না অপতথ্যের প্রবাহ। ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মিথ্যা দাবি, যুবলীগ নেতার পুরোনো ছবিকে শিবিরের বলে প্রচার, ভুয়া ফটোকার্ডের মাধ্যমে ছাত্রলীগের নেতাদের নামে অপপ্রচারের ঘটনা দেখা গেছে এই দিনগুলোয়। যেমন- ৩ আগস্ট একটি গণমাধ্যমের আদলে তৈরি ফটোকার্ডের মাধ্যমে প্রচার করা হয়, বোরকা পরে ঢাকা ছেড়েছেন ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম ও ইনান। পরদিন আবার একই কায়দায় আরেকটি গণমাধ্যমকে জড়িয়ে প্রচার করা হয়, মাঠের কর্মসূচি রেখে ভারতে পালালেন ছাত্রলীগের ৪ নেতা সাদ্দাম, ইনান, সৈকত ও শয়ন। প্রকৃতপক্ষে, এই দুটি ফটোকার্ডই ছিল ভুয়া। শেষদিকে এসে নিজেদের কর্মসূচি স্থগিতের ভুয়া দাবিরও শিকার হতে হয়েছে সরকার এবং আন্দোলনকারী দুই পক্ষকেই। 

দায়িত্বশীল জায়গা থেকেও হয়েছে অপতথ্যের প্রচার

৩৬ দিনের টানা আন্দোলনে সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা যেমন অপতথ্যের প্রচারে শামিল ছিলেন, তেমনি দায়িত্বশীল অনেক জায়গা থেকেও এসেছে অপতথ্য। এমনকি একাধিক গণমাধ্যমকেও ভুয়া তথ্যের প্রচার করতে দেখা গেছে। ১১ জুলাই ‘কুবি শিক্ষার্থীদের পেটাচ্ছে পুলিশ, ভিডিও করছেন প্রক্টর’ শীর্ষক দাবিতে একটি ছবি একটি গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়। অথচ, তিনি প্রক্টর ছিলেন না, ছিলেন ক্যাম্পাসের একজন সাংবাদিক। আন্দোলনে ভুয়া তথ্যের প্রচার করেছে এমন তালিকায় থাকা গণমাধ্যমের মধ্যে রয়েছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস (১টি), ফেস দ্যা পিপল (২টি), ঢাকা পোস্ট (১টি), বাহান্ন নিউজ (১টি)। অপতথ্য প্রচারে সরব ছিল ভারতীয় গণমাধ্যমও। ২১ জুলাই ‘ইন্ডিয়া টুডে এনই’তে দাবি করা হয়, ‘শেখ হাসিনাকে ঢাকায় তার বাসভবন থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার বর্তমান অবস্থান অজানা রয়ে গেছে।’ অথচ সেদিন তিনি ঢাকাতেই ছিলেন। 

তবে সবচেয়ে চমক হয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে প্রচার হওয়া একটি ভুল তথ্য। ১৫ জুলাই নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার দাবি করেন, তাদের তথ্যমতে এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ২ জন নিহত হয়েছে। রিউমর স্ক্যানার তাৎক্ষণিক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করে। আলোচিত দাবিটির সূত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘’আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং ঢাকার মিডিয়া ও যোগাযোগের ওপর নির্ভর করছি।’ অথচ মিলারের বক্তব্যের আগে গণমাধ্যমে মৃত্যুর কোনো তথ্যই আসেনি।

আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃস্থানীয় পর্যায় থেকেও যেমন অপতথ্যের প্রচার ছিল তেমনি দলগুলোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোও হয়ে উঠেছিল অপতথ্যের সূত্র। এই আন্দোলনে প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও সমর্থন ছিল। তারা এর সমর্থনে বাংলাদেশ বৈধ পথে টাকা পাঠিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বিরাট অবদান রাখার বদলে হুন্ডি বা অবৈধ পথে টাকা পাঠানোর ঘোষণা দেন। তার প্রেক্ষিতে ২৮ জুলাই আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়, যেখানে দেখা যায়, একজন চাকরিদাতা তার কর্মীদের বেতন দিয়ে তা বৈধ পথে ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠিয়ে রেমিট্যান্স হিসেবে অবদান রাখতে উৎসাহ দিচ্ছেন এবং একপর্যায়ে প্রায় সবাই বৈধ পথে ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাবেন বলে সায় দেন। তবে যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি সে সময়েরই নয়, গত বছরের এপ্রিলের। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের পেজ থেকেও আরও অন্তত চারটি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পায় রিউমর স্ক্যানার। পিছিয়ে ছিলেন না দলটির নেতা-নেত্রীরাও। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সে সময়ের সরকার দলীয় মেয়র তাহসিন বাহার সূচনা কথিত একটি বিজ্ঞপ্তির ছবি দিয়ে ২ আগস্ট এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, তিন সমন্বয়ক পাকিস্তান হাইকমিশনের সহযোগিতা চেয়েছেন। একই দাবি প্রচার করেন ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতও। যাচাই করে দেখা যায়, হাইকমিশন প্রকাশিত ভিন্ন একটি বিজ্ঞপ্তিকে সম্পাদনা করে ভুয়া বিজ্ঞপ্তিটি তৈরি করা হয়েছে। 

অন্যদিকে, ছাত্রদলের ফেসবুক পেজ থেকে ২৯ জুলাই ঢাকার মিরপুর-১০ এলাকা আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার দখলে নেওয়ার দৃশ্য দাবিতে একটি ছবি প্রচার করা হয়। আদতে ছবিটি ছিল ১৬ জুলাইয়ের। ৩১ জুলাই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক এক ফেসবুক পোস্টে ফেস দ্যা পিপলের বরাত দিয়ে দাবি করেন, সেনাবাহিনীর ১৫ জনের বেশি সদস্য পদত্যাগ করেছেন। অথচ ‘ফেস দ্যা পিপল’ এমন কোনো তথ্যই প্রচার করেনি। 

কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতনের সময়কালে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামের একটি সংগঠন। জুলাইতে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ৬৫ সদস্যের একটি সমন্বয়ক কমিটি গঠনের মাধ্যমে এই সংগঠনের কার্যক্রম শুরু করেন। এই সংগঠনের অফিশিয়াল ফেসবুক গ্রুপ থেকেও অপতথ্য প্রচার হতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার।

৩ আগস্ট এক পোস্টে আরটিভির ডিজাইন সম্বলিত ফটোকার্ডের মাধ্যমে দাবি করা হয়, ‘রাজধানীতে আজ থেকেই মিষ্টির দাম বাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।’ আদতে এমন কোনো সংবাদ দেয়নি গণমাধ্যমটি। একই গ্রুপের আরেক পোস্টে দাবি করা হয়, ৩ আগস্ট কুমিল্লায় হামলায় ১২ জন শহিদ হয়েছেন। সংগঠনটির সে সময়ের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ৩ আগস্ট ঢাকায় এক সমাবেশেও একই ঘটনা নিয়ে দাবি করেন, কুমিল্লায় একজন শহিদ হয়েছে। তবে যাচাই করে দেখা যায়, কুমিল্লায় সেদিনের বিক্ষোভ মিছিলকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হলেও কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

শহিদ-সম্মুখ সারির ব্যক্তিদের নিয়েও অপতথ্য 

‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’কে জড়িয়ে নিয়মিত অপতথ্যের প্রচার ছিল আন্দোলনের দিনগুলোয়। ২২ জুলাই প্রচার করা হয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফি মারা গেছেন। দাবিটি ছিল ভুয়া। সংগঠনটির বর্তমান মুখপাত্র সিনথিয়া জাহিন আয়েশাও ২২ জুলাই মারা গেছেন বলে ভুয়া দাবি প্রচার হয় সামাজিক মাধ্যমে। 

আন্দোলনে সংঘর্ষে ১৮ জুলাই ফারহান ফাইয়াজ নামে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের এক শিক্ষার্থী নিহত হন। তাকে নিয়ে সেদিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘কালবেলা’র বরাত দিয়ে প্রচার করা হয়, ফারহান ফাইয়াজের টিউশন শিক্ষক শিবির কর্মী এবং ফারহানকে খুনের সঙ্গে তার শিক্ষক জড়িত। অথচ কালবেলা এমন কোনো সংবাদই দেয়নি। একইদিন ঢাকার উত্তরায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র মীর মাহফুজুর রহমান (মুগ্ধ)। পরবর্তী সময়ে ফেসবুকে একজন নারীর সাক্ষাৎকারের ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়, তিনি মুগ্ধর মা। তবে যাচাই করে দেখা যায়, তিনি আন্দোলনের আরেক শহিদ তাহির জামান প্রিয়র মা। 

৪ আগস্ট আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও বাকের মজুমদারের ছবি যুক্ত করে ‘বোরকা পরে ঢাকা ছাড়লেন তিন সমন্বয়ক’ শীর্ষক শিরোনামে একটি গণমাধ্যমের ফটোকার্ডের ডিজাইন সম্বলিত একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়। একইদিন আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলমের বাসা থেকে দুই কোটি টাকা উদ্ধার দাবিতে দুটি গণমাধ্যমের আদলে তৈরি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়। এসব ফটোকার্ড ছিল ভুয়া। 

আন্দোলন পরিণতি পেলেও থামেনি অপতথ্য 

৫ আগস্ট টানা আন্দোলনের ফলাফল পায় ছাত্র-জনতা। শেখ হাসিনা বিদায় নেন মসনদ ছেড়ে। আন্দোলন পায় সফল পরিণতি। কিন্তু এরপরও থামেনি এই আন্দোলন নিয়ে অপতথ্যের প্রচার ও প্রসার৷ অভ্যুত্থানের এক বছর পর এসেও আন্দোলন নিয়ে নিয়মিত বিরতিতে অপতথ্যের প্রচার লক্ষ্য করেছে রিউমর স্ক্যানার। আওয়ামী লীগ সরকার পতন পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলনকে জড়িয়ে প্রচার হওয়া ৩৩টি অপতথ্য (৩১ জুলাই পর্যন্ত) শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। 

এসব অপতথ্যের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন রংপুরে শহিদ হওয়া শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। এর শুরুটা হয় ৬ আগস্ট। সেদিন আবু সাঈদের কবরে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় সম্মান জানাচ্ছে দাবিতে একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে যাচাই করে দেখা যায়, এই ভিডিও আবু সাঈদ শহিদ হওয়ার পূর্ব থেকেই অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। গত ২৮ জুলাই পর্যন্ত তাকে নিয়ে আরও অন্তত ১৩টি অপতথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। এগুলোর মধ্যে শেখ হাসিনার একটি ভুয়া দাবিও রয়েছে। ২৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজে আবু সাঈদের মৃত্যু নিয়ে শেখ হাসিনার একটি অডিও রেকর্ড প্রচার করা হয়। সেখানে তিনি দাবি করেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর আবু সাঈদকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তবে দাবিটি অনুসন্ধান করে রিউমর স্ক্যানার জানতে পারে, ১৬ জুলাই দুপুর ২:১৮ মিনিটে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিস্তেজ হয়ে রাস্তায় ঢলে পড়ার পরই আবু সাঈদকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয় এবং তিনটার দিকেই রিকশা করে তাকে হাসপাতালে পৌছাঁনো হয়। 

২০ নভেম্বর সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয়, মুগ্ধ ও স্নিগ্ধ (মুগ্ধর ভাই) আসলে একই ব্যক্তি এবং মুগ্ধ নামে কেউ ছিল না। তবে যাচাইয়ে দাবিটি ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। 

আগস্টে সরকার পতনের পরপরই একটি দাবি বেশ ভাইরাল হয়। পাবনায় আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাফিউল ইসলাম রাফি নামের একজন মারা যান এবং মারা যাওয়ার সময় সে তার বাবা নেই ও ছোটবোনকে দেখে রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন বলে ফেসবুকে দাবি করা হয়। তবে যাচাই করে দেখা যায়, রাফি গুলিবিদ্ধ হলেও পরবর্তী সময়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন। রাফির মা নেই, তবে বাবা বেঁচে আছেন। ছোট বোনকে দেখে রাখার বিষয়েও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

গত জানুয়ারিতে ঢাবির বর্তমান প্রো-ভিসি ড. মামুন আহমেদ এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে একটি ফোনালাপের অডিও রেকর্ড ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। দাবি করা হয়, এটি গত জুলাই আন্দোলনে দিকনির্দেশনার ফোনালাপ। ফ্যাক্টচেক করে জানা যায়, এটি ২০১৮ সালের ঘটনা। 

অভ্যুত্থান পরবর্তী বিভিন্ন সময়েই পুলিশকে নিয়ে একটি অপতথ্য বেশ কয়েকবার প্রচার হয়েছে। দাবি করা হয়ে থাকে, ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে ১৫ জন নিহত পুলিশ সদস্যের মধ্যে একজন গর্ভবতী নারী পুলিশ সদস্য ছিলেন এবং তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই দাবিতে এক নারী পুলিশ সদস্যের ছবিও প্রচার করা হয়। ১০ আগস্ট প্রথম দাবিটি প্রকাশ্যে আসার পরদিনই এ বিষয়ে ফ্যাক্টচেক করে রিউমর স্ক্যানার জানায়, নিহত ১৫ জন পুলিশ সদস্যের মধ্যে কেউ নারী ছিলেন না এবং প্রচারিত ছবিটি ভিন্ন এক নারী পুলিশ সদস্যের। পৃথিবী চাকমা নামের এই নারী পুলিশ সদস্য বর্তমানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত। গত এপ্রিলেও একই দাবি এআই দিয়ে তৈরি ছবির মাধ্যমে প্রচার হয়েছে ফেসবুকে। 

গত ১৪ অক্টোবর ফেসবুক আওয়ামী লীগের পেজ থেকে দাবি করা হয়, জুলাই-আগস্টে হওয়া উক্ত আন্দোলনে নিহত পুলিশের সংখ্যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশের সদর দপ্তর প্রকাশ করেনি। অথচ ১৮ আগস্টই নিহত পুলিশ সদস্যদের তালিকা প্রকাশ করে পুলিশ সদর দপ্তর। তালিকা অনুযায়ী, ২০ জুলাই থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এর আগে অক্টোবরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘টাইম’-এর বরাতে দাবি করা হয়, আন্দোলনের সময় ছাত্রদের দ্বারা ৩২০৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। অথচ ‘টাইম’ এমন কোনো তথ্যই প্রকাশ করেনি। 

গত ডিসেম্বর থেকে তিনটি আলাদা দাবি নজরে আসে রিউমর স্ক্যানারের, যেগুলোতে বলা হচ্ছিল আন্দোলনে শহিদ হওয়া ভোলার নয়ন, কুমিল্লার দাউদকান্দিতে আব্দুল্লাহ মাহবুব নামে একজন এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকিব নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর ফিরে এসেছে। এই তিনটি দাবিই ভুয়া বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। 

অপতথ্যের লাগামে নিরন্তর চেষ্টা 

একটি বড় ইস্যু যখন সামনে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাকে ঘিরে গুজবের প্রচার ও প্রসার ঘটে। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই পূর্ব অভিজ্ঞতা রিউমর স্ক্যানার কাজে লাগিয়েছে কোটা আন্দোলন ইস্যুতেও। আমরা শুরু থেকেই এই আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুততম সময়ে ভুয়া তথ্যের ফ্যাক্টচেক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্ততিও ছিল টিমের সদস্যদের। ওয়েবসাইটে ফ্যাক্টচেক প্রকাশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হওয়ায় তিনটি পন্থার প্রয়োগ করে রিউমর স্ক্যানার। 

প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোয় তাৎক্ষণিক ফ্যাক্টচেকের সারসংক্ষেপ পোস্ট করা হতো। যেমন, ১৮ জুলাই বিএনপি নেতা আমির খসরুর নামে কথিত কলরেকর্ডের দাবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর তাৎক্ষণিক তা যাচাই করে গ্রুপে পোস্ট করা হয়। তবে ওয়েবসাইটে তা প্রকাশিত হয় ৩০ জুলাই। 

শুধু ফ্যাক্টচেকই নয়, চাহিদা অনুযায়ী খবরও জানানো হতো রিউমর স্ক্যানারের গ্রুপে। যেমন, ১৬ জুলাই আবু সাঈদের মৃত্যুর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে গ্রুপে পোস্ট করা হয়েছিল সেদিন দুপুরেই।  

দ্বিতীয়ত, ১৬ জুলাই থেকে আন্দোলনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি আমলে নিয়ে দ্রুততম সময়ে ফ্যাক্টচেক প্রকাশের জন্য রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে প্রথমবারের মতো লাইভ আপডেট ফিড চালু করা হয়। আন্দোলন নিয়ে সময়ে সময়ে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যের ফ্যাক্ট এবং এই আন্দোলন ঘিরে বিভিন্ন হালনাগাদ তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে এই ব্যবস্থা করেছিল রিউমর স্ক্যানার। নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে এই আন্দোলনে মৃত্যুর সংখ্যাও প্রতিদিন হালনাগাদ করা হতো এই পাতায়। ৫ আগস্ট সকাল পর্যন্ত এই ফিড চালু রাখা হয়। 

তৃতীয়ত, রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটের ফ্যাক্টচেকের প্রথাগত ফরম্যাট বদলে সংক্ষিপ্তকরণের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ফ্যাক্টচেক প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়।  

তবে এমন উদ্যোগগুলোর পরও বাধাগ্রস্ত হয়েছে ফ্যাক্টচেকিং কার্যক্রম। জুলাই-আগস্টে আন্দোলনের সময়ে অন্তত পাঁচবার ইন্টারনেট শাটডাউনের ঘটনা ঘটেছে। কখনো নির্দিষ্ট এলাকায়, কখনো-বা সারা দেশে একযোগে মোবাইল এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ ছিল এ সময়গুলোয়। 

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে পাঁচ দফায় ২২ দিন ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ঘটেছে। নিয়ন্ত্রণ ছিল ভিপিএনের ওপরও। ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হওয়ায় তাৎক্ষণিক ভুল তথ্য শনাক্তে বেগ পেতে হয় ফ্যাক্টচেকারদের। 

বাংলাদেশ-ভারতে সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের অভিন্ন ছক

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম
বাংলাদেশ-ভারতে সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের অভিন্ন ছক
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাসাবাড়ি ও স্থাপনাও হামলার শিকার হয়। পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় রিউমর স্ক্যানার বেশ কিছু এক্স অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে, যেগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে প্রচার করেছে।

প্রায় দুই বছর পর, চলতি বছরের মে মাসে ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনাকে ঘিরেও একই ধরনের অপতথ্য ছড়াতে দেখা যায়। তবে এবার মূল প্ল্যাটফর্ম ছিল ফেসবুক এবং অপপ্রচারে সক্রিয় ছিল বাংলাদেশি প্রোফাইলগুলো। চলতি মাসের প্রথম ২১ দিনে রিউমর স্ক্যানারের শনাক্ত করা সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই বাংলাদেশি অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে- ভারতীয়দের পূর্ববর্তী অপপ্রচারের প্রতিক্রিয়ায় কি এবার বাংলাদেশিরাও ‘পাল্টা বয়ান’ তৈরিতে নেমেছে?

রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সাম্প্রদায়িক বয়ান: ২০২৪-এর এক্স ট্রেন্ড

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র নয় দিনে অন্তত ৫০টি এক্স অ্যাকাউন্ট বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে অপতথ্য প্রচার করেছে। শনাক্ত হওয়া কনটেন্টগুলোর ৮০ শতাংশই ছিল ভিডিওভিত্তিক। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ভিডিও ছিল পুরোনো বা ভিন্ন ঘটনার, আর বাকি ভিডিওগুলো সরকার পতনের পর সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাকে ধর্মীয় নিপীড়নের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে। শনাক্ত হওয়া অ্যাকাউন্টগুলোর প্রায় ৭২ শতাংশ নিজেদের ভারতভিত্তিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, পুরোনো, ভিন্ন দেশের বা অপ্রাসঙ্গিক ছবি-ভিডিওকে ‘বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন’ দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। কোথাও রাজনৈতিক সহিংসতাকে ধর্মীয় নিপীড়ন হিসেবে দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও ভুল পরিচয় ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করা হয়েছে। ‘গণহত্যা’ বা ‘পরিকল্পিত হামলা’র মতো উসকানিমূলক শব্দও ব্যবহার করা হয়। শুধু বেনামি অ্যাকাউন্ট নয়, ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যম, ভেরিফায়েড প্রোফাইল ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় কিছু পরিচিত অ্যাকাউন্ট থেকেও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর নজির পাওয়া যায়।

বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ও বাংলাদেশি প্রোফাইলের অপতথ্য

ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতাকে কেন্দ্র করে মে মাসজুড়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়ায়। রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক বিশ্লেষণে অন্তত ২৮টি অপতথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশি প্রোফাইলের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে ১৩টি কনটেন্টে ভিন্ন ঘটনার ভিডিও বা ছবি সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দাবি করে প্রচার করা হয়। এছাড়া পাঁচটি ছিল ভিন্ন দেশের কনটেন্ট এবং দুটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঘটনার ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। অন্তত পাঁচটি কনটেন্টে সাজানো বা স্ক্রিপ্টেড ঘটনার উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।

প্ল্যাটফর্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম ছিল ফেসবুক। শনাক্ত হওয়া ২৮টি অপতথ্যই এই প্ল্যাটফর্মে ছড়ানো হয়। পাশাপাশি ১১টি ইনস্টাগ্রামে, পাঁচটি ইউটিউবে, দুটি করে এক্স ও থ্রেডসে এবং একটি টিকটকে প্রচারিত হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমেও ভুয়া দাবি ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্যাক্টচেক অনুযায়ী, কোথাও পুরোনো সহিংসতার ভিডিওকে ‘নির্বাচনের পর মুসলিমদের ওপর হামলা’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে, আবার কোথাও বিদেশি ঘটনার ফুটেজকে ভারতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলে চালানো হয়েছে। বেশিরভাগ পোস্টেই ধর্মীয় পরিচয় ও আবেগনির্ভর ভাষা ব্যবহার করে ঘটনাগুলোকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা দেখা গেছে।

বাংলাদেশ থেকে ভারত: সংকটকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের অভিন্ন কৌশল

২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ‘Akshit Singh’ নামের একটি ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে ১০ হাজারের বেশি হিন্দু নিহত হয়েছে। পরে যাচাই করে দেখা যায়, এ দাবির কোনো ভিত্তি নেই। একইভাবে চলতি মে মাসে বাংলাদেশি কিছু ফেসবুক প্রোফাইল ও পেজ দাবি করে, ভারতে সহিংসতায় ‘৭২ ঘণ্টায় ৪৮৭ মুসলিম নিহত’ হয়েছে। কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, ৪ থেকে ১৩ মে পর্যন্ত সহিংস ঘটনায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে মাত্র একজন মুসলিম।

দুই ক্ষেত্রেই বাস্তব ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে ধর্মীয় আবেগ উসকে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। একদিকে “১০ হাজার হিন্দু নিহত”, অন্যদিকে “৭২ ঘণ্টায় ৪৮৭ মুসলিম নিহত”- উভয় দাবিই ছিল ভিত্তিহীন। অর্থাৎ, বাস্তব ঘটনার সঙ্গে অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর তথ্য যুক্ত করে ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে ভয়, ক্ষোভ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

২০২৪ ও ২০২৬ সালের অপতথ্য প্রচারণার মধ্যে আরও বেশ কিছু মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সহিংসতা বা অস্থিরতাকে ধর্মীয় নিপীড়নের রূপ দেওয়া হয়েছে। পুরোনো বা প্রসঙ্গবহির্ভূত ছবি-ভিডিও ব্যবহার, ভুল পরিচয় আরোপ এবং আবেগনির্ভর ভাষা ছিল অপপ্রচারের প্রধান কৌশল। ‘গণহত্যা’, ‘পরিকল্পিত হামলা’, ‘মুসলিম নিধন’ বা ‘হিন্দু নির্যাতন’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে জনমনে ক্ষোভ ও ভয় তৈরির প্রবণতাও ছিল স্পষ্ট।

তবে প্রচারণার ধরনে কিছু পার্থক্যও দেখা গেছে। বাংলাদেশকে ঘিরে ২০২৪ সালের অপতথ্যে এক্স ছিল প্রধান প্ল্যাটফর্ম এবং ভারতীয় ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট ও গণমাধ্যমের সক্রিয়তা বেশি ছিল। অন্যদিকে ভারতের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নিয়ে বাংলাদেশি প্রোফাইলগুলোর অপপ্রচারে ফেসবুকভিত্তিক নেটওয়ার্কের ভূমিকা বেশি দেখা গেছে। পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, থ্রেডস ও টিকটকেও একই বয়ান ছড়ানো হয়।

পাল্টা প্রোপাগান্ডার চক্র

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতকে ঘিরে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের প্রবণতা মূলত এক ধরনের পাল্টা প্রোপাগান্ডার ধারাবাহিকতা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাঈদ আল-জামান একে ‘ডিজিটাল প্রতিশোধপরায়ণতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। 

তার ভাষায়, “এক দেশের ব্যবহারকারীরা অন্য দেশের ঘটনাকে রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে।”

ভারতীয় সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ীর পর্যবেক্ষণও একই ধরনের। তার মতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ঘটনাকে ঘিরে ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্টগুলোর অপপ্রচার এবং ২০২৬ সালে ভারতের সহিংসতাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি প্রোফাইলগুলোর অপতথ্য- দুটিই একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি। তিনি বলেন, বাস্তব সংকটকে ভিত্তি করে দুই দেশেই অর্ধসত্য, বিকৃত তথ্য ও মিথ্যা নির্মাণ করে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পুরোনো ভিডিও, ভিন্ন দেশের ছবি বা প্রসঙ্গবহির্ভূত কনটেন্ট ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। ‘ভুক্তভোগী বনাম নির্যাতনকারী’ ধরনের আবেগনির্ভর কাঠামো তৈরি করে মানুষের অনুভূতিকে প্রভাবিত করা হচ্ছে।

সাঈদ আল-জামানের ভাষায়, “পুরোনো ভিডিও বা প্রসঙ্গবহির্ভূত ছবি হলেও সেটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, যদি তা নিজের গোষ্ঠীর বয়ানের সঙ্গে মিলে যায়।”

অর্ক ভাদুড়ীর মতে, বাংলাদেশে ইসলামপন্থি এবং ভারতে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর ‘মোডাস অপারেন্ডি’ অনেকটাই একই ধরনের। 

তার ভাষায়, “ফেক নিউজ ছড়ানোর ক্ষেত্রেও আমরা দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত ঐক্য দেখছি।”

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক মেরুকরণ, আবেগনির্ভর কনটেন্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম- এই তিনটি উপাদান অপতথ্য ছড়ানোর গতি বাড়িয়ে দেয়। ধর্মীয় উত্তেজনামূলক কনটেন্ট বেশি প্রতিক্রিয়া পায় বলেই অ্যালগরিদমও সেগুলো আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।

তাদের সতর্কবার্তা, অনলাইন গুজব কেবল ভার্চুয়াল জগতের সমস্যা নয়; এটি বাস্তবেও সংঘর্ষ ও সহিংসতার কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে এ ধরনের অপতথ্য বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অবিশ্বাস, ঘৃণা ও বিভাজন তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক ও তথ্য-পরিবেশের জন্য এটি এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

থালাপতি বিজয়ের নামে মিথ্যা প্রচার

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ০১:০৫ পিএম
থালাপতি বিজয়ের নামে মিথ্যা প্রচার
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় ওরফে থালাপতি বিজয়

ভারতের তামিলনাড়ুর নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় ওরফে থালাপতি বিজয়ের নামে প্রচারিত ‘আমার রাজ্যে যদি কোনো হিন্দু মুসলিমদের ওপর অত্যাচার করে, তাহলে এর ফল বিশ্বে ইতিহাস হয়ে যাবে। কাউকে ছাড় দেবো না কে কোন ধর্মের সেটা বড় কথা নয় নাগরিকের অধিকার সবার’ শীর্ষক মন্তব্যটি মিথ্যা বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার।

এই দাবিতে দেশের একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কালবেলা, চ্যানেল আই, ডিবিসি নিউজ, আমার দেশ, এনটিভি, ইত্তেফাক, মানবজমিন, মাছরাঙা টিভি, জাগোনিউজ২৪, সময়ের আলো, খবরের কাগজ, নয়া দিগন্ত, গ্লোবাল টিভি, এনপিবি নিউজ, দৈনিক সংগ্রাম, বার্তা বাজার, বাংলা টিভি, আমার সংবাদ, টাইমস টুডে, ঢাকা প্রকাশ, বায়ান্ন টিভি, বাংলাদেশ টাইমস, জনবাণী, বিডি২৪রিপোর্ট, দ্য নিউজ, সুখবর।

রিউমর স্ক্যানার জানায়, থালাপতি বিজয় এই মন্তব্য করেননি। প্রকৃতপক্ষে, ফেসবুকের অসমর্থিত পেজ থেকে অন্তত ৯ মে থেকে দাবিটি ছড়ানোর পর, যাচাই ছাড়াই গণমাধ্যমেও সেটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়।

থালাপতি বিজয় আলোচিত দাবি সংক্রান্ত কোনো মন্তব্য করেছেন কিনা তা জানতে কিওয়ার্ড সার্চ করে ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইটে ১১ মে ভোরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শপথের পর দেওয়া বক্তব্যে সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে বিজয় বলেছেন, তার সরকার তাদের পাশে থাকবে। তিনি বলেন, ‘আপনারা বিজয়কে শতভাগ বিশ্বাস করতে পারেন। আমি হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান-সবারই সমান।’ 

তার এমন বক্তব্যে আলোচিত দাবি সংক্রান্ত কোনো তথ্য মেলেনি।

অমিয়/

এসএসসির ভুয়া প্রশ্ন বিক্রির ফাঁদ: টেলিগ্রাম চক্রে পরীক্ষার্থীর নাম

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
এসএসসির ভুয়া প্রশ্ন বিক্রির ফাঁদ: টেলিগ্রাম চক্রে পরীক্ষার্থীর নাম
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

প্রতিবছরের মতো এবারও এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এবার প্রতারণার ধরনে এসেছে নতুন মাত্রা। ফেসবুক গ্রুপ ও টেলিগ্রাম চ্যানেলকে কাজে লাগিয়ে পরীক্ষার্থীদের কাছে ‘ফাঁস হওয়া প্রশ্ন’ বিক্রির প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে ব্যবহার করা হচ্ছে এআই প্রযুক্তিতে সম্পাদিত প্রশ্নপত্রের ছবি। এরপর টেলিগ্রাম বটের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে টাকা।

রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই প্রতারণাচক্রে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর, টেলিগ্রাম বটের ইউজারনেম এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তারিখ ২৯ এপ্রিল, ২০২৬। চলমান এসএসসি পরীক্ষার মাঝেই পরদিনের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পরীক্ষাকে ঘিরে শুরু হয় নতুন ধরনের প্রতারণার তৎপরতা। ২৮ এপ্রিল দুপুর থেকেই ফেসবুকে ‘Ssc 2026 প্রশ্ন ফাঁস গ্রুপ’ নামের একটি গ্রুপে আইসিটি প্রশ্ন দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শেয়ার করা হচ্ছিল টেলিগ্রামের লিংক।

‘Raja Roy’ নামের একটি ভুয়া ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ২৯ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত এ–সংক্রান্ত মোট ১৭টি পোস্ট করা হয় গ্রুপটিতে। পোস্টগুলোতে দাবি করা হচ্ছিল, টেলিগ্রাম চ্যানেলে যোগ দিলেই পাওয়া যাবে পরীক্ষার প্রশ্ন।

তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রচারিত প্রশ্নের ছবিটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। ছবির বানান ভুল ও অস্বাভাবিক লেখার ধরন বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। আরও যাচাই করে রিউমর স্ক্যানার দেখতে পায়, ২০২৫ সালের এসএসসির আইসিটি প্রশ্নপত্রের ছবিকে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদনা করেই নতুন এই ভুয়া প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে।

ফেসবুকের পোস্টগুলোতে টেলিগ্রামের যে লিংক দেওয়া ছিল সেটি মূলত একটি চ্যানেল। টেলিগ্রাম চ্যানেলটির নাম SSC Question Sell। সাবস্ক্রাইবার ৩৮০০-এর বেশি। গত ২৭ এপ্রিল এটি খোলা হয়। সেদিনই ‘Ssc 2026 প্রশ্ন ফাঁস গ্রুপ’ নামের ফেসবুক গ্রুপটিতে চ্যানেলটির প্রচারণা শুরু হয় Raja Roy নামের ভুয়া প্রোফাইলটি থেকে। কিছুটা কৌশল নিয়ে প্রথমে প্রশ্ন চেয়ে পোস্ট করা হয় প্রোফাইলটি থেকে। কয়েক ঘণ্টা পর একই প্রোফাইল থেকে টেলিগ্রামের আলোচিত চ্যানেলটি থেকে প্রশ্ন পাওয়া গেছে জানিয়ে পোস্ট করা হয়। এরপর থেকে নিয়মিত এই প্রোফাইল টেলিগ্রাম চ্যানেলটির প্রচারণা চালিয়ে আসছে এই গ্রুপে। 

২৭ এপ্রিল থেকেই সংশ্লিষ্ট টেলিগ্রাম চ্যানেলে বিভিন্ন বার্তার মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন পাওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছিল। বিশেষ করে ২৯ এপ্রিল, আইসিটি পরীক্ষার আগের পুরো দিনজুড়ে সেখানে ধারাবাহিকভাবে ‘প্রশ্ন দেওয়া হবে’ দাবি করে বার্তা প্রকাশ করা হয়।

এসব পোস্ট ও মেসেজে আইসিটি বিষয়ের এআই-সম্পাদিত ভুয়া প্রশ্নপত্রের ছবির একটি অংশ ব্যবহার করা হয়, যাতে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। একই সঙ্গে জানানো হয়, প্রশ্ন পেতে হলে ১০০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে এবং যোগাযোগ করতে হবে @Joyesh_Bot ইউজারনেমযুক্ত ‘Redwan’s_Method_Crackers’ নামের একটি টেলিগ্রাম বট আইডিতে।

রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের একজন প্রতিনিধি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ওই বট আইডিতে যোগাযোগ করলে প্রথমেই জানতে চাওয়া হয়- কোন শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্ন প্রয়োজন। প্রতিনিধি ঢাকা বোর্ডের কথা জানালে প্রতারক পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেদিন রাত ১০টায় একটি আলাদা প্রাইভেট গ্রুপে প্রশ্ন সরবরাহ করা হবে। এর বিনিময়ে দাবি করা হয় ৯০০ টাকা।

নম্বর চাওয়ার পর এই বিকাশ নম্বর (01718974531) দেওয়া হয়। রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট নম্বরটি বিভিন্ন মাধ্যমে যাচাই করে দেখেছে। ট্রু কলারে নম্বরটির বিপরীতে ‘Gour Sundor Kaku’ নাম পাওয়া যাচ্ছে। বিকাশে একই নম্বরের পরিচয়ধারী হিসেবে ‘Gour Sundar Biswas’ নাম রয়েছে। নিকনেম ব্যবহার হচ্ছে ‘Scammer 1’। সার্চ ইঞ্জিন গুগলের বদৌলতে একই নম্বর বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের ওয়েবসাইটে যশোরের সিদ্দিপাশা ইউনিয়নের পেজেও পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে এই নম্বরের বিপরীতে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা পদে থাকা গৌর সুন্দর বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ রয়েছে। 

প্রাথমিক অনুসন্ধানে মোবাইল নম্বরটির বিপরীতে সম্ভাব্য মাধ্যমগুলোয় একই নাম পাওয়ার প্রেক্ষিতে নম্বরটি ফেসবুকে সার্চ করে এই নামে একটি প্রোফাইল খুঁজে পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট। 

যাচাই করে দেখা যায়, ‘গৌর সুন্দর বিশ্বাস’ নামের এই প্রোফাইলটি অন্তত ২০২২ সাল থেকে সক্রিয় রয়েছে ফেসবুকে। ওই বছর বিভিন্ন টিভি সিরিয়ালের লিংকের একটি গ্রুপের এডমিন হয়ে নিয়মিত সেখানে পোস্ট করা হতো। 

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে বিভিন্ন শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় দেখা যায় প্রোফাইলটিকে, নিয়মিত পোস্ট করা হতো পড়াশোনা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান চেয়ে।

এই প্রোফাইল থেকে শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্ম টেন মিনিট স্কুলের একটি ফেসবুক গ্রুপে ২০২৪ সালের এপ্রিলে করা একটি পোস্ট নজরে আসে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের, যাতে বলা হয়, পোস্টদাতার নাম জয়েশ বিশ্বাস (Joyesh Biswas)। তিনি নোয়াপাড়া শংকরপাশা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। ওই সময়ে সে নবম শ্রেণিতে পড়ছিল। এই পোস্টেও একই মোবাইল নম্বরটি দেওয়া ছিল। 

নোয়াপাড়া শংকরপাশা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি যশোরের অভয়নগরে অবস্থিত। বিদ্যালয়টির ওয়েবসাইট থেকে তার পরিচয় নিশ্চিত হতে পেরেছে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট।  

টেন মিনিট স্কুলের গ্রুপটি এবং আরেক শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্ম Redwan’s Method-এর একটি গ্রুপে গত বছরের ডিসেম্বরে জয়েশ তার এসএসসির টেস্ট পরীক্ষার একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্টের ছবি পোস্ট করে। এসব পোস্ট থেকে জানা যায়, জয়েশ এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে।  

জয়েশের বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ফলাফল পর্যালোচনায় বোঝা যায়, সে মেধাবী একজন শিক্ষার্থী। তার ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল ঘেঁটে গেমিংয়ের নেশা থাকার বিষয়টি লক্ষ্য করা গেছে। তার সঙ্গে গৌর সুন্দর বিশ্বাসের সম্পর্কের বিষয়ে ওপেন সোর্স অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, টেলিগ্রামে বট প্রোফাইলটির ইউজার নেম তারই নামে এবং বটের নাম রাখা অনলাইনের একটি শিক্ষা সহায়তা প্ল্যাটফর্মের নামে যেখানে সে নিজেও শিক্ষার্থী ছিল। যদিও এই অনুসন্ধান চলাকালীন এই নাম বদলে ফেলা হয়। বর্তমান নাম, ‘বাংলাদেশ শিক্ষাবোর্ড (Payment)।’

আজ রবিবার সকাল পর্যন্ত টেলিগ্রামের চ্যানেলটিতে এসএসসির ছয়টি বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁসের ভুয়া দাবি ছড়ানো হয়েছে। এসব প্রশ্ন পেতে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩০০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে। এমনও দেখা গেছে, একই বিষয়ের প্রশ্নের জন্য তিনবার তিন পরিমাণ (প্রথমে ২০০০, পরে ১২০০, সবশেষে ১০০০) অর্থ চাওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত মেসেজগুলোয় ব্যবহার করা হচ্ছে এআই দিয়ে সম্পাদনা করে তৈরি ভুয়া প্রশ্ন। 

এসএসসির প্রশ্নফাঁসের গুজবকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার নতুন ও উদ্বেগজনক এই প্রবণতা দুশ্চিন্তার তৈরি করছে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে। এআই দিয়ে ভুয়া প্রশ্নের ছবি তৈরি, টেলিগ্রাম বট ব্যবহার করে অর্থ লেনদেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিত প্রচারণা-সব মিলিয়ে প্রতারকরা এখন আরও কৌশলী ও সংগঠিত হয়ে উঠছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে পরীক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিতও মিলছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতা ও অনলাইন প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিকে সামনে আনছে। পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগকে পুঁজি করে পরিচালিত এসব কার্যক্রম শুধু আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিই তৈরি করছে না, বরং শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষাপদ্ধতির প্রতি আস্থাও দুর্বল করে দিচ্ছে।

শেখ হাসিনার হজে যাওয়ার ভিডিও প্রচার, যা জানা গেল ফ্যাক্ট চেকে

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম
শেখ হাসিনার হজে যাওয়ার ভিডিও প্রচার, যা জানা গেল ফ্যাক্ট চেকে
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয়ে নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের দিল্লি বিমানবন্দর হয়ে পবিত্র হজ পালন করতে সৌদি আরব যাচ্ছেন, এমন একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।

ভিডিওতে বিমানবন্দরের ভেতরের দৃশ্য দেখে বোঝা যাচ্ছে, এটি হজযাত্রীদের যাত্রার জন্য নির্ধারিত একটি টার্মিনাল। ছবির কেন্দ্রে সাদা শাড়ি ও মাথায় ওড়না পরা শেখ হাসিনা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তার গলায় একটি আইডি কার্ড ঝুলছে এবং হাতে তসবিহ ধরা। হাতে ঝোলানো একটি ছোট ব্যাগ, যেখানে ‘Hajj 2024’ লেখা দেখা যায়। এটি ইঙ্গিত করে তিনি হজ পালনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করছেন। কিন্তু ২০২৪ লেখা দেখে খটকা লাগা স্বাভাবিক।

আরেকটি ভিডিওতে শেখ হাসিনাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছেন চারজন সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী, পেছনের দিকে আরও কয়েকজন হজযাত্রী দেখা যাচ্ছে, যারা সাদা ইহরাম পোশাক পরা এবং লাগেজসহ এগোচ্ছেন। সবমিলিয়ে, হজযাত্রার একটি পরিবেশ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিটিতে। ফেসবুকে ‘শেখ হাসিনা জয় বাংলা’ নামের একটি পেজে ছবিটি রিলস আকারে পোস্ট করে ক্যাপশনে বলা হচ্ছে, ‘দিল্লি এয়ারপোর্ট থেকে হজ্ব করার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’।

এসব ভিডিও যাচাই করতে গিয়ে রিউমর স্ক্যানার গুগলের বিশেষ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির শরণাপন্ন হয়। ছবিটি সিন্থআইডি দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই ছবিটির পুরো অংশ বা অনেকটা অংশই গুগল এআই ব্যবহার করে তৈরি বা এডিট করা হয়েছে।

শুধু এই ছবিই নয়, শেখ হাসিনার হজযাত্রা দাবিতে আরও দুইটি ছবি এবং একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে আসল দাবিতে ছড়িয়েছে আওয়ামীপন্থি বিভিন্ন পেজে।

এসব কনটেন্ট যে এআই দিয়ে বানানো তা প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণে সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, অসংখ্য মানুষ এসব কনটেন্টকে বাস্তব ধরে নিয়ে মতামত দিচ্ছেন।

এ বছর প্রথম হজ ফ্লাইট যাত্রা করে গত ১৭ এপ্রিল। ভারতে পরদিন ১৮ এপ্রিল সে দেশের প্রথম হজ ফ্লাইট ছেড়ে গেছে দিল্লি থেকে। সেদিনই দুপুরে শেখ হাসিনার আলোচিত ছবিটি ছড়াতে দেখা যায়। 

১৯ এপ্রিল সকালে আরেকটি ছবি প্রচার করা হয়। দাবি করা হয়, শেখ হাসিনা সৌদি বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন। বিশ্লেষণ বলছে, এটিও এআই দিয়ে তৈরি হওয়া ছবি। 

সফরের ধারাবাহিক কার্যক্রম হিসেবে এরপর সৌদি বাদশাহর আমন্ত্রণে শেখ হাসিনার ভোজের দৃশ্য ‘সৌদি বাদশার বিশেষ আমন্ত্রণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শেখ হাসিনা।’ শিরোনাম দিয়ে পোস্ট করা হয়েছে পেজে। এই পোস্টটি ভাইরাল হয়েছে অবশ্য ভিন্ন ক্যাপশনে। একাধিক পেজে ছবিটি দিয়ে বলা হচ্ছে, “সৌদী জুবরাজের আমন্ত্রণে একসঙ্গে খাবার খাচ্ছেন শেখ হাসিনা ! জুবরাজ বলেছেন হাসিনাকে সম্মানের সাথে বাংলাদেশে না ফিরতে দিলে কঠিন পদক্ষেপ দিবে সৌদি সরকার!” 

গুগল জেমিনি জানাচ্ছে, এআই দিয়ে তৈরি ছবিটি বিশ্লেষণে প্রেক্ষাপট, ব্যক্তিদের মুখাবয়ব ও অঙ্গভঙ্গি এবং খাবার ও টেবিলের ডিটেইলস সংক্রান্ত অসঙ্গতি চোখে পড়ে। এ ধরনের এআই-তৈরি কনটেন্টকে সাধারণ মানুষ সত্য ধরে নেওয়ার ফলে বাস্তবতা ও কল্পনার সীমা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, অপতথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

অমিয়/

হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য মিথ্যা: রিউমর স্ক্যানার

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৪:১১ পিএম
হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য মিথ্যা: রিউমর স্ক্যানার
ছবি: রিউমর স্ক্যানার

গত আট বছর দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি বলে সাংবাদিকদের কাছে যে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, তা ভুল বলছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার।

অনুসন্ধান করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশব্যাপী হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি হয়েছিল। ইউনিসেফের প্রবন্ধ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হয় এই তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানটি। 

গতকাল (২৯ মার্চ) সাংবাদিকদের কাছে এক বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। এরপর আর এই ভ্যাকসিন কোনো গভর্নমেন্ট দেয় নাই। আমরা কিন্তু এর মধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। পারচেজ কমিটি পাশ হয়েছে।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একাধিক প্রবন্ধ সামনে আসে।

২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হামের টিকাদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশে।

ইউনিসেফের প্রবন্ধে জানানো হয়, ‘সম্প্রতি দেশজুড়ে ৩ কোটি ৬০ লক্ষ শিশুকে হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়ার বিশাল কাজটি যারা সম্পন্ন করেছেন এমন হাজার হাজার বাংলাদেশি স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে ইয়োচুঙ্গু একজন। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার এই টিকা অভিযানটি সম্পন্ন করে।’

সেখানে আরও বলা হয়, ‘২০২০ সালের মার্চ মাসে এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এটি স্থগিত করা হয়। এমনকি ২০২০ সালের ডিসেম্বরে একবার চালু করার পরে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ছিল যে, এবারের কার্যক্রম অন্যবারের চেয়ে ভিন্নতর হবে। অবশেষে টিকা দেওয়ার জায়গাগুলিতে ভিড় এড়াতে তিন সপ্তাহের পরিকল্পিত কার্যক্রমকে ছয় সপ্তাহব্যাপী চালানো হয়।’

এ বিষয়ে ফেসবুকেই ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারির মধ্যে অসংখ্য পোস্ট খুঁজে পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার, যেগুলোতে সেসময় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের আওতায় শিশুদের টিকা দেওয়ার সময়ের ছবিসহ আনুষ্ঠানিক তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি যে সত্য নয় তা স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা একটি জাতীয় দৈনিককে জানান, এটি সত্য নয়; টিকা ইপিআইয়ের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ এবং সব সময় দেওয়া হয়। নিয়মিত টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, তাই কয়েক বছর পরপর ক্যাম্পেইন করা হয়।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপ-পরিচালক মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘অনেক শিশু ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। তাই টিকাদানের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সর্বশেষ ২০২০ সালে ক্যাম্পেইন চালিয়েছে; ২০২৪ সালে করার পরিকল্পনা থাকলেও তা হয়নি। এপ্রিলে নতুন ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা রয়েছে। গ্যাভির সহায়তায় সারা দেশে হামের টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি চার বছর অন্তর ফলোআপ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়, যাতে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা যায়। 

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) বাইরেও বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে হামের টিকা পাওয়া যায়। সাধারণত বেসরকারি পর্যায়ে এমএমআর (মিজেলস, মাম্পস, রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়, যা হামের পাশাপাশি মাম্পস ও রুবেলা থেকেও সুরক্ষা দেয়। চলতি বছরও এমন টিকা দেওয়ার পোস্ট পাওয়া গেছে ফেসবুকে। 

টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা বিভাগের (ইপিআই) নিজস্ব ড্যাশবোর্ড রয়েছে, যেখানে বছরভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ সংক্রান্ত ডাটাবেজ থেকে জানা যায়, অন্তত ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিবছরই এই টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে। এই হার কখনোই ৭০ শতাংশের নিচে নামেনি। তবে ২০২৫ সালের কোনো তথ্য এই ডাটাবেজে নেই। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা বিভাগের (ইপিআই) নিজস্ব ড্যাশবোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হামের টিকাদান হার কখনোই ৮১ শতাংশের নিচে নামেনি। তবে ২০২৫ সালে এই হার দাঁড়িয়েছে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশে। 

তবে টিকা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ড্যাশবোর্ডের তথ্য অসম্পূর্ণ।

অর্থাৎ, গত ৮ বছরে হামের টিকা সরকার দেয়নি বলে যে দাবি ছড়াচ্ছে তা সঠিক নয়। সুতরাং, গত আট বছরে দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের দাবিটি মিথ্যা।

অমিয়/