নবম পর্ব
মিডিয়ার নানামুখী রিপোর্টে মামুনের বেসামাল অবস্থা। কিছুতেই তিনি সামাল দিতে পারছিলেন না। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, এবার মিডিয়া হাউস করতে হবে। হাতে মিডিয়া হাউস থাকলে কেউ আর আমার বিরুদ্ধে লিখতে সাহস পাবে না।
মামুন সিদ্ধান্ত পাকা করতে না করতেই এসে গেল করোনা মহামারি। বিমানের ব্যবসায় ধস নামল। অসংখ্য লোককে ছাঁটাই করা হলো। তা নিয়েও পত্রিকাগুলোয় একের পর এক রিপোর্ট বের হলো। মামুন বললেন, না! আর দেরি করা যায় না। করোনার মধ্যেই তিনি পত্রিকা বের করবেন। তিনি নিজেই আসিফ আহমেদের মোবাইল নম্বর জোগাড় করে তাকে ফোন করে বললেন, ভাই আমার নাম মামুন। মানে আমেরিকা-বাংলা গ্রুপের...
হ্যাঁ হ্যাঁ! আপনার নাম শুনেছি। আমাকে সাদিক সাহেব বলেছেন আপনার কথা। শুনলাম, আপনি নাকি পত্রিকা বের করতে চান?
জি জি ভাই। আপনার সঙ্গে বসতে চাই। খুব জরুরি। আপনি যদি আমাকে একটু সময় দেন!
কখন বসতে চান?
আপনার সময় হলে আজও বসতে পারি।
আমার কোনো অসুবিধা নেই। আমি বাসাতেই আছি।
আমি তাহলে গাড়ি পাঠাই? আপনার ঠিকানাটা বলুন। আমি এখনই গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
ঠিক আছে। আমি এসএমএস করে দিচ্ছি।
আসিফ আহমেদ এসএমএস করে ঠিকানা দিলেন মামুনের মোবাইলে।
৮
মোহসীন আহমেদের হঠাৎ মৃত্যুচিন্তা মাথায় এল। তার কেন জানি মনে হচ্ছে, তিনি আর বেশি দিন বাঁচবেন না। এক জীবনে তিনি অনেক সহায়-সম্পত্তি করেছেন। বাবার রেখে যাওয়া সম্পদের চেয়ে কয়েক শ গুণ বাড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু এত সম্পদ ভোগ করবে কে! তার কোনো ছেলে সন্তান নেই। একটি মাত্র মেয়ে। সেই মেয়ে নিজেই স্বয়ংসম্পন্ন। কাজেই তাকে নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। তার চিন্তা হচ্ছে তার নিজের বিশাল সহায়-সম্পত্তি নিয়ে। স্ত্রীর জন্যও তিনি যা রেখেছেন তা তার তিন জীবনেরও শেষ হবে না।
মোহসীন আহমেদ মনে মনে ভাবেন, সহায়-সম্পত্তি ট্রাস্ট করে দিলে কেমন হয়! আমাদের মৃত্যুর পর সব সম্পত্তি ট্রাস্টি বোর্ডের কাছে চলে যাবে। ট্রাস্টি বোর্ড এটা পরিচালনা করবে। ট্রাস্ট মানবকল্যাণে কাজ করবে। দেশের অবহেলিত ও বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা দান, দেশে কারিগরি শিক্ষার প্রসার, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, উদ্যোক্তা তৈরির জন্য কর্মসূচি গ্রহণ, দারিদ্র্যবিমোচনে সহায়তাদানসহ দেশের অবহেলিত মানুষের জন্য ব্যয় করা হবে।
মোহসীন আহমেদ বিষয়টা নিয়ে তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে কথা বললেন। তাকে যখন তিনি তার পরিকল্পনার কথা বললেন তখন আনোয়ারা বেগমও দ্বিমত করতে পারলেন না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি দিলেন। তারা উভয়েই আলোচনা করে ঠিক করেন, মোহিনীর সঙ্গে কথা বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে মোহিনী যে দ্বিমত করবেন না সেটা তারা ভালো করেই জানেন। কিন্তু কথাটা তো বলতে হবে! তার যেন আর তর সইছিল না।
মোহসীন আহমেদের কোনো কিছু মাথায় এলে তা না নামানো পর্যন্ত স্বস্তি পান না। এটা তার একটা বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্য হয়তো তার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া। তিনি তার বাপ-দাদার স্বভাবেও এমনটি দেখেছেন। তিনি বিষয়টা নিয়ে খাওয়ার টেবিলেই মোহিনীর সঙ্গে কথা বললেন।
সবকিছু শোনার পর প্রস্তাবটি মোহিনীর খুব মনে ধরল। ট্রাস্ট করার বিষয়টি তার মাথায় আসেনি। তিনি ভেবেছিলেন, একটি আধুনিক হাসপাতাল করবেন। যাতে দেশের মানুষকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে না হয়! আরেকটি বিষয়ও মোহিনীর মাথায় অনেকদিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এখন পর্যন্ত করোনার টিকা আবিষ্কার করা যায়নি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো মানুষকে ধ্বংস করার পারমাণবিক বোমা বানিয়েছে। কিন্তু করোনার মতো মহামারিতে মানুষকে রক্ষা করার কী উপায় তা নিয়ে গবেষণা করেনি। দেখা যাচ্ছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।
মোহিনী এমন একটি গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে চান, যেখানে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা হবে। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষকে রক্ষার প্রতিষেধক আবিষ্কার করবে। বিষয়টা মোহিনী তার মা-বাবাকেও বললেন। তারা সঙ্গে সঙ্গেই ইতিবাচক মাথা নেড়ে বললেন, উত্তম চিন্তা।
মোহসীন আহমেদ বললেন, ট্রাস্ট করলেও কোনো অসুবিধা নেই। ট্রাস্টের পক্ষ থেকেই এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
আনোয়ারা বেগমও স্বামীর কথায় সায় দিলেন। তিনি এও বললেন, তাছাড়া ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান তো মোহিনীকেই করা হবে! কী বলো?
মোহসীন আহমেদ বললেন, হুম। ও ছাড়া আর কে হবে?
মোহিনী বললেন, কেন? মাকে করা যায় না? মা নিশ্চয়ই এতে ভালো করবেন। আমার তো নিজের ব্যবসা আছে। সেটা দেখতে গিয়েই আমার ঘাম ছুটে যাচ্ছে!
আনোয়ারা বেগম বললেন, তার পরও ট্রাস্টি বোর্ড তোকেই সামলাতে হবে মা। আমি ওসব বুঝি না। তোকে আমি হেল্প করতে পারব। কিন্তু ট্রাস্টি বোর্ড পরিচালনা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া আমি এসব কাজে নিজেকে জড়াতে চাই না।
কেন মা? কাজের মধ্যে থাকলেই তো ভালো থাকবে!
না রে! আমাকে আর টানিস না। তোর সঙ্গে আমি আছিই।
মোহসীন আহমেদ বললেন, মোহিনী আমরা এখন বিদায়ের পথে!
হঠাৎ মোহিনীর মেজাজ বিগড়ে গেল। তিনি কিছুতেই তার বাবার কথাটা নিতে পারলেন না। তিনি বেদনামিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, বাবা! এসব কথা বলো না তো! কি এমন তোমাদের বয়স হয়েছে!
মোহসীন আহমেদ কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার পর তিনি প্রসঙ্গটা পাল্টানোর জন্য বললেন, ট্রাস্টি বোর্ড যদি একটি হাসপাতাল ও গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেয়; তাহলে কে বাধা দেবে? আমার মনে হয়, ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের পরপরই একটি হাসপাতাল ও গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কী বলিস মোহিনী?
মোহিনী মুখে কিছুই বললেন না। তিনি ঘাড় নেড়ে তার কথায় সম্মতি জানালেন।
ব্যাস, শুরু হয়ে গেল কাজ। ‘আনোয়ারা-মোহসীন ট্রাস্ট’ নামে একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হলো। বোর্ডে তারা পরিবারের তিনজন ছাড়াও বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরর মধ্য থেকে চারজনকে রাখা হলো। মোট সাতজনের কমিটি। ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হলো মোহিনীকে।
মোহসীন আহমেদ ও আনোয়ারা বেগম তাদের সব সম্পদ ট্রাস্টি বোর্ডের নামে লিখে দিলেন। মা-বাবার সিদ্ধান্তে ভীষণভাবে আপ্লুত হন মোহিনী। তিনি আবেগতাড়িত কণ্ঠে বললেন, মানবতার জন্য তোমাদের এই ত্যাগ পৃথিবীর ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
চলবে...
আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন-
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮