‘জাগো, জাগো, বলরাম, ধরো তব মরুভাঙা হল
বল দাও, ফল দাও, স্তব্ধ করো ব্যর্থ কোলাহল।’
(‘লাঙল’-এর জন্য রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী।)
নজরুলের সম্পাদক-জীবন ও সাহিত্য-জীবনের বয়স প্রায় কাছাকাছি। শ্রমিকশ্রেণির মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত প্রথম খণ্ড (বিশেষ সংখ্যা)- ‘বুধবার ১লা পৌষ, ১৩৩২, ইং ১৬ ডিসেম্বর, ১৯২৫ সাল’-এ ‘লাঙল’ পত্রিকা। লাঙল পত্রিকা ছিল ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়’-এর সাপ্তাহিক মুখপত্র। যার ‘নগদ মূল্য এক আনা’। ১৯২৬ সালের ১৫ এপ্রিলে শেষ সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। ‘লাঙল’-এর মোট ১৫টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির গায়ে লেখা থাকত- ‘প্রধান পরিচালক নজরুল ইসলাম’। সম্পাদক মণিভূষণ মুখোপাধথ্যায়। প্রথম সংখ্যার প্রধান আকর্ষণ ছিল নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো। প্রথম পৃষ্ঠার মাঝখানে বড় করে লেখা ছিল- ‘এই সংখ্যার লাঙলের সর্ব্ব প্রধান সম্পদ কবি নজরুল ইসলামের কবিতা সাম্যবাদী’। ১৬ পৃষ্ঠার পত্রিকায় ৮ পৃষ্ঠাজুড়ে ছিল নজরুলের সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের সবগুলো কবিতা।
আমাদের হাজার বছরের সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে মাইকেল-রবীন্দ্রনাথের পর নজরুল। সমগ্র বাঙালি দেশ-কাল-সমাজ-সংস্কৃতিকে নজরুলকে নিয়ে একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ছাড়া তার মতো আর কেউ বোধ করি আলোড়িত-উজ্জীবিত করতে পারেননি। নজরুল মূলত কবি হিসেবে জনচিত্তে শ্রদ্ধার আসন পেলেও তিনি একাধারে ছিলেন গীতিকার, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, অনুবাদক, শিশুসাহিত্যিক, পত্রিকা-সম্পাদক প্রভৃতি। রবীন্দ্রনাথ সুবিশাল রবীন্দ্রসাহিত্য-সংস্কৃতি সাধনা দীর্ঘকাল পরিসরে পরিব্যাপ্ত; কিন্তু নজরুল-সাধনা মাত্র তেইশ বছরেই সমাপ্ত। তেইশ বছরের সাহিত্য-জীবন, তার পরও বেঁচেছিলেন কবি অনেক দিন।
কাজী নজরুল ইসলাম প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিঠি
কল্যাণীয়েষু,
অনেকদিন পরে তোমার সাড়া পেয়ে মন খুশী হোলো। কিছু দাবী করেছ- তোমার দাবী অস্বীকার করা আমার পক্ষে কঠিন। আমার মুশকিল এই, পঁচাত্তরে পড়তে তোমার এখনো অনেক দেরী আছে, সেই জন্য আমার শীর্ণ শক্তি ও জীর্ণ দেহের পরে তোমার দরদ নেই। কোনো মন্ত্রবলে বয়স বদল করতে পারলে তোমার শিক্ষা হোতো। কিন্তু মহাভারতের যুগ অনেক দূরে চলে গেছে, এখন দেহমনে মানব সমাজকে চলতে হয় সায়েন্সের সীমানা বাঁচিয়ে।...
তুমি তরুণ কবি, এই প্রাচীন কবি তোমার কাছ থেকে আর কিছু না হোক, কয়টা দাবী করতে পারে। অকিঞ্চনের কাছে প্রার্থনা করে তাকে লজ্জা দিও না। এই নতুন যুগে যেসব যাত্রী সাহিত্য-তীর্থে
ইতি ১৫ ভাদ্র, ১৩৪২ (আগস্ট, ১৯৩৫)
স্নেহরত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ব্রিটিশ ভারতের একজন বিশিষ্ট বিচারক ও আইনশাস্ত্রজ্ঞ স্যার আবদুর রহীম কলকাতার ‘জমিয়তে উলামা-ই-হিন্দ্’-এর সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষা যদি শিক্ষার বাহন হয় তাহলে বাঙালী মুসলমানের সর্ব্বনাশ হবে’। এ ঘটনা উল্লেখ করে ‘লাঙল’ পত্রিকায় মন্তব্য করা হয়েছে: ‘স্যার আবদুর রহীম নিজে সাম্প্রদায়িক বিষে জর্জ্জরিত হয়ে আছেন। সে বিষ তিনি বাঙলার সকল মুসলমানকে পান করাবার জন্যে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।…’ পত্রিকাটি গুরুত্বসহকারে ত্রয়োদশ সংখ্যার ১৪ পৃষ্ঠায় ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’ শিরোনামে স্যার আবদুর রহীমের সংবাদটি কড়া ভাষায় প্রতিবাদ করে।
নজরুল সম্পূর্ণ মানুষ। নজরুল এখনো আমাদের চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। নজরুল অত্যধিক জনপ্রিয় এ কারণে যে, তিনি কবি হিসেবে একই সঙ্গে পত্রিকা সম্পাদক, সাম্যবাদী ও সংগ্রামী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘হ্যাঁ, কাজী, তুমি আমাকে সত্যিই হত্যা করবে। আমি মুগ্ধ হয়েছি তোমার কবিতা শুনে। তুমি যে বিশ্ববিখ্যাত কবি হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তোমার কবিতার জগৎ আলোকিত হোক, ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা করি।’ আমরা নজরুলকে অখণ্ড সম্পূর্ণ মানুষরূপে পেতে চাই বর্তমানে-ভবিষ্যতে। যে কবি বলতে পারেন- ‘শ্মশানে আমি গাহি সদা জীবনের গান’। শতবর্ষী ‘লাঙল’ পত্রিকা গবেষণা করলে আমাদের নতুন পথের সন্ধান দেবে। নজরুলের কথাতেই শেষ করি-
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্লিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান।