‘নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি বিলীন হওয়ার পর থেকে যাযাবরের মতই ছিল জীবনটা। একটুখানি সুখের আশায় অনেক জায়গায় গিয়েছি। তবে প্রতিবারই নিরাশ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। অভাবের সংসারে অনাহারে থাকতে হয়েছে। ৬ বছর বয়সের শিশু সন্তানের ৩ বছরের অধিকাংশ সময় কেটেছে অন্যের বাসা থেকে সংগ্রহ করা ভাতের মাড় খেয়ে। এতকিছুর পরেও কেউ সহায়তার হাত বাড়ায়নি। তবে এখন সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছে। আমার সন্তানকে ভাতের মাড় খেয়ে থাকতে হবেনা, নাইবা ছেঁড়া জামাকাপড় পরতে হবে।’ দেশের জনপ্রিয় দৈনিক খবরের কাগজ পত্রিকার পাঠক সংগঠন বন্ধুজনের উদ্যোগে দেওয়া উপহার সামগ্রী পেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে উপরোক্ত কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার আশাশুনির উপজেলার আলমগীর হোসেন ও রুবিনা খাতুন দম্পতি।
আবেগাপ্লুত হয়ে অতীতে কষ্টের কথা শুনিয়েছেন। উপহার সামগ্রী পাওয়ার আগে তারা ছিলেন সমাজের অবহেলিত, দুখী, ভাসমান মানুষ। তাদের সুখের সেই কান্নায় তৈরী হয় এক আবেগঘন দৃশ্যের। বন্ধুজনের উপহার পেয়ে তারা যে কতটা খুশি, তা বেরিয়ে আসে বন্ধুজনের প্রতি তাদের দোয়া আর ভালবাসায়।
জানা যায়, গত এক দশক আগেও ভাতের অভাব ছিলনা আলমগীর-রুবিনা দম্পতির পরিবারে। বসবাস করতেন আশাশুনি মরিচ্চাপ নদীর তীরে। তবে অপরিকল্পিতভাবে নদী খননের ফলে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায় আলমগীর হোসেনের বসতভিটা। এরপর যাযাবরের মতো দেশের বিভিন্ন ইটভাটা ও রাইস মিলে পরিবারসহ কাজ করে নিজ সংসারের ভরণপোষণ যোগাতেন তিনি। তবে শারীরিক অক্ষমতার কারণে মালিকপক্ষের মনমতো কাজ করতে না পারায় সেখান থেকেও বিতারিত হতে হয় আলমগীরকে। একপর্যায়ে উপায়ন্তর না পেয়ে বাঁকড়া ব্রীজের ভেড়িবাঁধের স্লোপে (পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা) বেড়া আর নারকেল গাছের পাতার ছাউনি দিয়ে বসবাস করতে থাকেন আলমগীর ও রুবিনা দম্পতি। এসবের ভিতরে জন্ম হয় শিশু আফসানা খাতুন আঁখির।
আঁখির বয়স যত বাড়তে থাকে সাংসারিক খরচও তত বাড়তে থাকে আলমগীরের সংসারে। তবে শারীরিকভাবে ভারী কাজ করতে অক্ষম হওয়ায় বছরের অধিকাংশ সময় বেকার থাকতে হয় আলমগীরকে। অপরদিকে রুবিনা কাজ করলেও নায্য মজুরী থেকে বঞ্চিত হন। তার ওপর প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ায় সবসময় কাজ না পাওয়ায় এই দুরবস্থা সৃষ্টি হয় তাদের সংসারে।
সহায়তা পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আফসানার মা রুবিনা খাতুন। ছবি: খবরের কাগজ
এতে করে একমাত্র শিশু সন্তান আফসানার দৈনন্দিন ভাতের চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হয় শিশুটির পরিবার। ভাতের বদলে অন্যের বাসা থেকে মাড় সংগ্রহ করে পেটের ক্ষুধা নিবারণ করতে হতো তাদের। অন্যের ফেলে দেওয়া পুরাতন জামা-কাপড় ছিল তাদের একমাত্র ভরসা।
এনিয়ে গত ২৪ জানুয়ারি খবরের কাগজ পত্রিকায় ‘ভাতের মাড় খেয়েই দিন পার’ শীর্ষক শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটি প্রকাশ হওয়ার পর থেকে পরিবারটিকে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেয় বন্ধুজন।
একপর্যায়ে শুক্রবার (৩১ জানুয়ারি) বিকালে সাতক্ষীরা বন্ধুজনের উদ্যোগে শিশুটির পরিবারের জন্য একবছরের জামাকাপড়, ব্যবসার জন্য বস্ত্র, সেলাইমেশিন, ৬ মাসের খাদ্যসামগ্রী, জ্বালানি সাশ্রয়ী চুলা, শিশুটির জন্য স্কুল ব্যাগ, একবছরের শিক্ষাসামগ্রী, বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য একমাসের যাতায়াত খরচ ও বিভিন্ন উপকরণ শিশুটির পরিবারের মাঝে তুলে দেওয়া হয়। এসময় বন্ধুজনের উপহার সামগ্রী পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শিশুটিসহ তার পরিবারের সদস্যরা।
এসময় উপস্থিত ছিলেন খবরের কাগজ পত্রিকার সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ও বন্ধুজন সাতক্ষীরার উপদেষ্টা সাংবাদিক নাজমুল শাহাদাৎ জাকির, সমাজ সেবক মাব্বাস হোসেন, বন্ধুজন সাতক্ষীরার সভাপতি অর্পণ বসু, দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক শারিয়ার আনজুম সিফাত, সদস্য শেখ তুরান প্রমুখ।
এসময় খবরের কাগজ পত্রিকাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে আলমগীর হোসেন ও রুবিনা খাতুন বলেন, এতদিন গল্পে জেনেছিলাম। সংবাদের মাধ্যমে অসহায় মানুষের ভাগ্যের বদল ঘটে। তবে আজ সেটার প্রমাণ আমরা নিজেরা।
তারা জানান, পত্রিকাটি যদি সংবাদ প্রকাশ না করত তাহলে এর কোনো সহায়তা আমরা পেতাম না।
এজন্য পত্রিকাটির সংগঠনের মাধ্যমে যে বা যারা আমাদের সহযোগীতা করেছেন তাদের সবার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
বন্ধুজন সাতক্ষীরার সভাপতি অর্পণ বসু বলেন, বন্ধুজন বরাবর অসহায় মানুষের ভাগ্য বদলে কাজ করে যাচ্ছে। বিগত বছরেও বন্ধুজন সাতক্ষীরার উদ্যোগে প্রায় শতাধিক মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। যেটা ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে।
সমাজসেবক মাব্বাস হোসেন বলেন, খবরের কাগজ পত্রিকাটির মাধ্যমে তারা পরিবারটির বিষয়ে জানতে পারেন। পরে প্রবাসে অধ্যায়নরত তার ভাই বন্ধুজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের মাধ্যমে কিছু উপহার সামগ্রী শিশুটির পরিবারে দেওয়া হয়েছে। তবে কেউ যদি পরিবারটিকে জমি দেয় অথবা সরকারি জমি ডিসিআর করে দেয় তাহলে শিশু আফসানার পরিবারের জন্য তার ভাই ঘর তৈরি করে দিবেন বলে জানান তিনি।
বন্ধুজন সাতক্ষীরার উপদেষ্টা ও খবরের কাগজ পত্রিকার সাতক্ষীরা প্রতিনিধি সাংবাদিক নাজমুল শাহাদাৎ জাকির বলেন, সংবাদটি করার আগে খবরের কাগজ পত্রিকার মফস্বল বিভাগের সঙ্গে পরিবারটির বিষয়ে কথা হয়। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা মোতাবেক সংবাদটি প্রিন্ট ও ডিজিটালে প্রকাশ হয়। পরবর্তী সময়ে অনেকে সহায়তার হাত বাড়ান। বন্ধুজনের নিজস্ব ফান্ডসহ প্রবাসী শিক্ষার্থী, বন্ধুজন সাতক্ষীরার উপদেষ্টা ও লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মন্ডল, প্রভাষক ইদ্রিস আলী, সিদ্দীক'স সবুজ চুলার উদ্ভাবক মোস্তাক আহমেদ সিদ্দিকীসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ সুপারের স্ত্রী সহায়তার হাত বাড়ান। তাদের থেকে বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ করে সেগুলো ওই পরিবারের মাঝে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নাজমুল শাহাদাৎ জাকির/মাহফুজ