১৯২৫ সালের ২১ মে চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলাম হুগলি থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান বিপ্লবী, ঋষি অরবিন্দের একান্ত অনুগামী, অধ্যাত্ম সাধক, প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা, সঙ্ঘগুরু শ্রীশ্রী মতিলাল রায়কে চিঠিতে লেখেন -
মতিলালদা,
এরা তিনজন উত্তরবঙ্গ থেকে আসছেন দেশভ্রমণে। এরা সকলেই ছাত্র, খুব ভালো ছেলে। প্রবর্তক সংঘের দেখবার মতো বস্তুগুলি এদেরকে দেখিয়ে দেবেন। এরা আমার সহোদর প্রতিম।
ইতি -
নজরুল
নজরুল স্মৃতি-বিজড়িত জায়গাগুলো সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে অবগত করার উদ্দেশে নজরুলপ্রেমীদের সঙ্গে নিয়ে ছায়ানট (কলকাতা) দীর্ঘ ১৮ বছর কাজ করছে। নজরুল-চর্চার ধারাবাহিকতায়, চন্দননগরে অবস্থিত প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে বইয়ের পাতায় আমার পরিচয় ঘটে। পরবর্তীতে যাওয়ার সুযোগ হয় এবং প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের বর্তমান সম্পাদক শ্রী প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করি।
প্রদীপদার কথায় জানতে পারি - সঙ্ঘগুরু শ্রীশ্রী মতিলাল রায়কে নজরুল ‘মতিলালদা’ বলে সম্বোধন করতেন। সঙ্ঘজননী রাধারাণী দেবীর অকৃত্রিম স্নেহ নজরুল পেয়েছিলেন। অন্নপূর্ণা মন্দির, যেখানে রাধারাণী দেবী অবস্থান করতেন সেখানে অবলীলায় নজরুল প্রবেশ করতেন, মা অতি যত্নসহকারে নজরুলকে খাবার পরিবেশন করতেন এবং খাওয়ার পর নজরুলের হাতে একটি পান দিতেন। নজরুল সেই পান না চিবিয়ে গালে রেখে দিতেন, তাঁর সামনে হারমোনিয়াম দেওয়া হতো, নজরুল একের পর এক শ্যামাসঙ্গীত পরিবেশন করতেন। নজরুলের পরিবেশনায় মা-সহ আশ্রমকন্যারা অভিভূত হতেন।
বাসন্তী সঙ্গীত বিদ্যাবীথির প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষক এবং কাজী নজরুল ইসলামের সহযোগী সঙ্গীতশিল্পী মনোরঞ্জন সেন তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন-‘‘কাজী নজরুল ইসলামকে প্রথম দেখি ১৯২১ সালে চন্দননগরে প্রবর্তক সংঘের কার্যালয়ে শ্রদ্ধাস্পদ মতিলাল রায়ের সান্নিধ্যে, একটি সম্মেলন উপলক্ষে। ঐ সম্মেলনে আমি ‘বন্দেমাতরম’ গেয়েছিলাম, আর সেই সুবাদেই পরিচিত হলাম কাজী সাহেবের সঙ্গে। ওঁর পরিধানে তখন খদ্দরের খাটো ধুতি ও চাদর। লম্বা চুল, উজ্জ্বল চোখ আর ঘর-কাঁপানো হাসি তো ছিলই। পরিচয় হল বটে, তবে ঘনিষ্ঠতা নয়। কাজী সাহেবের সঙ্গীতচর্চার বেশির ভাগটাই তখন স্বদেশী গান নিয়ে, গাইছেন ‘বল নাহি ভয় নাহি ভয়’, ‘ভাই হয়ে ভাই চিনবি আবার’, ‘এস এস ওগো মরণ’, ‘আজি রক্ত নিশি ভোরে’, ‘কারার ঐ লৌহকপাট’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ প্রভৃতি গান। আমি মূলতঃ ক্ল্যাসিকাল চর্চা করি শুনে বাংলা গান গাওয়ার উৎসাহ দিলেন। মাঝে-মধ্যে দেখা হলেও ঘনিষ্ঠতা শুরু হল ১৯২৬ সাল নাগাদ।’’
প্রবর্ত্তক সঙ্ঘে নজরুল বেশ কয়েকবার যান, সেই সম্পর্কে মনোরঞ্জন সেনের এই লিখিত স্মৃতিচারণা অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। 'প্রবর্ত্তক সঙ্ঘ’ নামটির সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। প্রবর্ত্তক পত্রিকার প্রাক্-শতবর্ষ প্রথম সংখ্যার শুরুতেই লেখা হয় -
‘প্রবর্ত্তক। মাত্র এই একটি শব্দের অভিঘাত ও ব্যঞ্জনা যে কতটা মর্ম্মভেদী হতে পারে ইতিহাস-বিস্মৃত আজকের প্রজন্মের সে বিষয়ে কোন ধারণা নেই। তবে যাঁরা প্রাচীন ও বিশিষ্ট; বিশেষতঃ যাঁরা বাঙালির বিগত এক শতাব্দীর হাল-হকিকতের খোঁজ-খবর রাখেন, তাঁদের কাছে প্রবর্ত্তকের নতুন করে পরিচয় দেওয়া বাতুলতা মাত্র। কারণ প্রবর্ত্তকের ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাস পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে।’
পত্রিকার সম্পাদক লিখেছেন - ‘হঠাৎই পুরনো প্রবর্ত্তকের ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে পেলাম সেই মহামূল্যবান বিশল্যকরণী! কাজী নজরুলের একটি কবিতা - প্রবর্ত্তকের ঘুর্-চাকায়। মন বলল - অবশ্যই পারবে। প্রবর্ত্তকের চাকা তো অবিরত ঘুরছে। সে তো থামবার নয়।’
প্রবর্ত্তকের ঘুর্-চাকা কবিতায় নজরুল তারুণ্যের জয়গান গেয়েছিলেন -
যায় মহাকাল মূর্চ্ছা যায়
প্রবর্ত্তকের ঘুর্ চাকায়।
যায় অতীত
কৃষ্ণকায়
যায় অতীত
রক্ত-পায়—
যায় মহাকাল মূর্চ্ছা যায়
প্রবর্ত্তকের ঘুর্ চাকায়!
প্রবর্ত্তকের ঘুর্ চাকায়!
যায় প্রবীণ
চৈতী বায়,
আয় নবীন
শক্তি আয়!
যায় অতীত্
যায় পতিত্
আয় অতীথ্
'আয়রে আয়'—
বৈশাখী ঝড় সুর্ হাঁকায়—
প্রবর্ত্তকের ঘুর্ চাকায়!
প্রবর্ত্তকের ঘুর্ চাকায়!
‘প্রবর্ত্তক শতবার্ষিক সংকলন’-এ বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্রদের লেখা প্রকাশিত হয়েছে, বলাই বাহুল্য নজরুলের কবিতা ও গান খুব স্বাভাবিকভাবেই এই পত্রিকায় স্থান পেয়েছে। এই পত্রিকা সম্বন্ধে সম্পাদক শুভেন্দু মজুমদার সংক্ষেপে পাঠকদের ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
তিনি লিখেছেন - আজকের পাঠকদের কাছে খুব সংক্ষেপে অতীতের প্রবর্ত্তক পত্রিকা সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন। বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে একদিকে যেমন বহু পত্র-পত্রিকার আবির্ভাব হয়েছে, অন্যদিকে আবার মহাকালের নিয়মে সেগুলির মধ্যে কোন কোনটি চিরতরে বিদায় নিয়েছে। প্রবর্ত্তক পত্রিকার জন্মের সঙ্গে শ্রী অরবিন্দ, বিপ্লবতীর্থ চন্দননগর এবং বিশেষ করে প্রবর্ত্তক পত্রিকা ও পরবর্তীকালে প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের জন্মদাতা শ্রী মতিলাল রায়ের নাম বিশেষভাবে যুক্ত। আজকের প্রজন্মের অধিকাংশ বাঙালি না জানলেও এ কথা ইতিহাস-স্বীকৃত যে, প্রবর্ত্তক পত্রিকা ও প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের সাথে আমাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত, রয়েল ৮ পেজি ১৬ পৃষ্ঠার একটি পূর্ণ পাক্ষিক হিসেবে ফরাসি চন্দননগর থেকে ১৯১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর (২৫ ভাদ্র, ১৩২২ বঙ্গাব্দ) প্রবর্ত্তক পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করেছিল। প্রতি সংখ্যার মূল্য ছিল এক আনা, বার্ষিক সডাক দুই টাকা। এই সাময়িক পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন মণীন্দ্রনাথ নায়েক। পত্রিকাটি প্রথমে চন্দননগরের কোরাল প্রেস থেকে ছাপা হতো। পত্রিকার নামকরণ শ্রী মতিলাল রায়ের। তিনিই ছিলেন প্রবর্ত্তকের প্রকৃত পরিচালক।
পত্রিকার নামকরণ প্রসঙ্গে শ্রী মতিলাল রায় লিখেছেন, ‘‘পত্রিকা বাহির হইবে, ইহা নিশ্চয়। কিন্তু কি তাহার নাম হইবে, তাহা জানিনা। তাহা ভগবান তখনও জানান নাই।... পরদিন অতি প্রত্যুষে শয্যাত্যাগ করিয়া ধ্যানে বসিলাম।...অন্তর্জগতের দুয়ার যেন উন্মুক্ত হইল। মুদিত চক্ষেই দেখিলাম - কয়েকটি জ্যোতির্ময় অক্ষর। বঙ্গাক্ষর নহে, দেবনাগরী অক্ষরে প্রবর্ত্তক এই শব্দটি আমি সুস্পষ্ট দেখিলাম...পত্রিকাখানির নাম ‘প্রবর্ত্তক’ হইবে, সকলকে জানাইলাম। কথাটা সকলেরই ভালো লাগিল।’’
এভাবেই শুরু হলো প্রবর্ত্তক পত্রিকার পথ চলা যা আজও বহমান। এই পত্রিকায় ১৩৪৯ বঙ্গাব্দে কার্ত্তিক সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল নজরুলের কবিতা-
অ-ধরা
কাছে তুমি থাক যখন, তখন আমি দিই না ধরা,
দূরে গিয়ে কাঁদ যখন, তখনই হই স্বয়ম্বরা।
তখন তোমার অভিসারে
মন ছুটে যায় অন্ধকারে
তখন ওঠে বিরহেরি ব্যাকুল রোদন পাগল-করা।।
প্রিয়, তুমি যবে রহ পাশে
কেন এত ভয় জাগে গো, কেন মনে দ্বিধা আসে?
ভিক্ষা যখন চাও ভিখারী,
হাত কাঁপে গো দিতে নারি —
তুমি চলে গেলে লুকিয়ে কাঁদি ভিক্ষা নিয়ে আঁচলভরা।
১৩৪৫ বঙ্গাব্দে কার্ত্তিক সংখ্যায় প্রকাশিত হয় নজরুল রচিত শ্যামা - সঙ্গীত —
পায়ের বেড়ী কাট্ল না তোর
আরও আঘাত হান্তে হবে।
ওরে আরও নিষ্ঠুর হ’
হয়ত শিকল টুট্বে তবে।।
(তুই) পালিয়ে যেতে চাইবি যত
প্রহরীরা ঘির্বে তত,
যত ফাঁকি চাইবি দিতে
(ওরা) ততই সজাগ হ'য়ে রবে।।
মায়ার ডোরে বন্দী ওরে, সহজে কি মুক্তি মেলে,
আয় বেরিয়ে, মিথ্যে সুখের জতুগৃহে
আগুন জ্বেলে।
বাঁধতে তোরে আস্বে ধেয়ে,
কাঁদ্তে কাঁদ্তে ছেলে মেয়ে,
দেখ্বি নারে পিছু চেয়ে
(এসব) মায়ার খেলা বুঝবি যবে।।
‘প্রবর্ত্তক শতবার্ষিক সংকলন’ গ্রন্থে সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি হিসেবে নজরুল সম্পর্কে লেখা হয়েছে-‘‘নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) পরিচিতি নিষ্প্রয়োজন। চির-বিদ্রোহী কবি নজরুলও রবীন্দ্রনাথের মতন প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের আদর্শের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। প্রবর্ত্তকের জন্য গান ও কবিতা লিখেছেন। ১৯২৪ সালে দ্বিতীয় বর্ষ অক্ষয় তৃতীয়া উৎসব ও মেলায় এসেছেন।’’
ইতিহাস-প্রসিদ্ধ প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের গ্রন্থাগারে এখনও শোভা পায় একটি বোর্ড, যেখানে উল্লেখ রয়েছে বহু গুণী মানুষের নাম, তাঁদের সম্পর্কে লেখা হয়েছে - ‘যাঁদের মলিন চরণধূলায়/ধন্য হয়েছে ধরণীতল।/আলোর-পথের যাত্রী তাঁরাই/প্রেরণা-প্রদীপ অচঞ্চল।’
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী, অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সরলা দেবী চৌধুরানী, শিল্পাচার্য্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ বহু প্রণম্য ব্যক্তি এই প্রবর্ত্তক সঙ্ঘে এসেছেন।
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ প্রবর্ত্তক সঙ্ঘ সম্পর্কে বলেছিলেন - ‘এই আশ্রমের সঙ্গে যেটুকু পরিচয়, হউক তা ক্ষণকালের - একদিনের, কয়েক ঘণ্টার, তা হলেও আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি এ কথা বলতে পারি, এখানে যে সত্যের আবির্ভাব ঘটেছে তার সম্পূর্ণতা, মহৎ সার্থকতা একদিন আসবেই।’
বিশ্বকবির আশীর্বাণীকে পাথেয় করে মানবতার দিশারী, সত্যের পূজারী প্রবর্ত্তক সঙ্ঘের পথচলা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হোক।
লেখক: নজরুল সঙ্গীতশিল্পী এবং সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)