মেহেরপুরের কৃষকরা সরকারি মূল্যে টিএসপি ও ডিএপি সার পাচ্ছেন না। ডিলার ও সাব-ডিলার পর্যায়ে সংকটের কথা বলা হচ্ছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, বেশি টাকা দিলেই বাইরের ব্যবসায়ীদের কাছে সার পাওয়া যাচ্ছে। চলমান এ সংকটের জন্য কৃষকরা ডিলারদের দায়ী করেছেন। তবে ডিলাররা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, একসঙ্গে অনেক সারের চাহিদার কারণে তারা সবাইকে সরবরাহ করতে পারছেন না। অন্যদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে দুষলেও ওই দপ্তরটির কর্মকর্তারা দায়সারা বক্তব্যের মধ্যেই নিজেদের কার্যক্রম আটকে রেখেছেন।
সম্প্রতি বেশি দামে অবৈধভাবে সার বিক্রি করতে গিয়ে এলাকাবাসীর হাতে আটক হন মেহেরপুর সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের ব্যবসায়ী ওবায়দুল্লাহ। প্রশাসন এসে তল্লাশি চালালে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ৩৮০ বস্তা সারের মজুত পায়। জেলার বাইরে থেকে সার কিনে এনে বেশি দামে বিক্রির বিষয়টি তিনি তখন স্বীকার করেন। সার বিক্রির লাইসেন্সও তার ছিল না। ওই দিনই আরও দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ৩৫০ বস্তা সার উদ্ধার করে সেনাবাহিনী।
ব্যবসায়ীরা জানান, বিএডিসি এবং বিসিআইসির ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে সার কিনে অসাধু ব্যবসায়ীরা মজুত করেছেন। এভাবেই কালোবাজারে বিক্রির মাধ্যমে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। অথচ কৃষকদের অভিযোগ, তারা ডিলারদের কাছ থেকে সার পাচ্ছেন না। শীতকালীন বিভিন্ন সবজির পাশাপাশি অন্যান্য আবাদের জন্য এখন চাহিদা থাকায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সারের দাম বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে জানান কৃষকরা।
মেহেরপুর সদরের উজলপুর গ্রামের কৃষক মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘ডিলারদের কাছে সার কিনতে গেলে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি টাকা দিলেই সার পাওয়া যাচ্ছে। আমরা সরকারি মূল্যে সার কিনতে পারছি না। তাই বাধ্য হয়ে বেশি দামে সার কিনছি। কোনো কোনো ডিলার এক বস্তা ডিএপি সারের সঙ্গে এক বস্তা ইউরিয়া কিনতে বাধ্য করছে। অথচ এই সময় ইউরিয়া সারের থেকে ডিএমপি ও টিএসপি সারের প্রয়োজন বেশি।’
ইমরান হোসেন নামে আরেক কৃষক বলেন, ‘১ হাজার ৫০ টাকার ডিএমপি ১ হাজার ৫৫০ টাকায় কিনেছি। দুই দিন ধরে ঘুরে অবশেষে একটি ডিলারের কাছে এক বস্তা সার নিয়ে জমিতে দিতে পেরেছি। এ ছাড়া টিএসপি ও এমওপি বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে অনেকেই সার উত্তোলন ও বিক্রির ক্ষেত্রে লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। সরেজমিন বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে এ অভিযোগের সত্যতা মেলে। গত ৪ ডিসেম্বর গাংনী উপজেলার নওপাড়া গ্রামে বিএডিসির তালিকাভুক্ত ডিলার বিশ্বাস ট্রেডার্সের খোঁজে গেলে জানা যায় এই নামে এখানে কোনো সারের বিক্রয়কেন্দ্র নেই। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সাজেদুর রহমানকে না পাওয়া গেলেও তার বাবা সৈয়দ আলী নিময় লঙ্ঘনের বিষয়টি স্বীকার করেন। মূলত হার্ডওয়্যারের একটি দোকান পরিচালনা করেন তিনি।
গত নভেম্বরে এই প্রতিষ্ঠান বিএডিসি থেকে ১৬ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন টিএসপি ও ১৭ দশমিক ২৫ টন এমওপি সার উত্তোলন করেছে। সৈয়দ আলী জানিয়েছেন, ‘সরকারি বরাদ্দের নিজের অংশের সার তিনি বিক্রি করে দিয়েছেন।’ এভাবে কৃষকদের কাছে বিক্রি না করে অন্য জায়গায় বিক্রি করায় সারের দাম বাড়ছে। অথচ চলতি মাসে জেলায় ১ হাজার ১৮১ টন টিএসপি, ১ হাজার ৪৪২ টন ডিএপি এবং ১ হাজার ৫২৭ টন এমওপি সার বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ডিলার শওকত আলী বলেন, ‘হঠাৎ করেই সারের চাহিদা অনেক বেশি বেড়ে গেছে। সার দিতে না পারায় অনেক কৃষককে খালি হাতে ফেরত পাঠাতে হয়েছে। গোডাউনে থাকা ডিএপি সার শেষ। আবার আনতে পারলে কৃষকদের দিতে পারব।’
জেলা বিসিআইসি সার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাফিজুর রহমান বলেন, আবহাওয়াজনিত কারণে গত দুই মাসে দুই দফা কৃষকদের আবাদ নষ্ট হয়েছে। পুনরায় ওই আবাদ করতে তাদের আবারও সার কিনতে হচ্ছে। এ ছাড়া তামাক কোম্পানিগুলো বিগত সব সময়ে সার বরাদ্দ দিলেও এবার কৃষকের হাতে নগদ অর্থ দিয়েছে। তামাক চাষের জন্য সরকারি সারের কোনো বরাদ্দ না থাকলেও কৃষকরা ডিলারদের কাছে ভিড় জমাচ্ছেন।
বিএডিসির সার কীভাবে অবৈধ ব্যবসায়ীদের কাছে যাচ্ছে- এমন প্রশ্ন কুষ্টিয়া বিএডিসির সার বিভাগের সহকারী পরিচালক মহিউদ্দিন মিয়া বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব শুধু তালিকাভুক্ত ডিলারদের বরাদ্দকৃত সার বুঝিয়ে দেওয়া। স্থানীয় পর্যায়ে সারের মনিটরিংয়ের দায়িত্ব ওই এলাকার কৃষি বিভাগের।’
তবে মনিটরিংয়ের বিষয়ে দায়সারা বক্তব্য কৃষি বিভাগের। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিজয় কৃষ্ণ হালদার বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা সার ব্যবসায়ীদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করেছি।’ সরকার-নির্ধারিত মূল্যে কৃষকের মাঝে সার বিক্রির বিষয়ে কৃষি বিভাগ সতর্ক রয়েছে বলেও জানান তিনি।