একসময় যেখানে ছিল ধানখেত, বসতভিটা, স্কুল, বাজার আর মানুষের কোলাহল, সেখানে এখন শুধু নদীর উত্তাল জলরাশি। নদীর পাড়ে দাঁড়ালে দেখা যায় ভাঙনের নির্মম চিত্র। টুকরো টুকরো মাটি হারিয়ে যাচ্ছে, আর তার সঙ্গে হারাচ্ছে মানুষের শেকড়, স্মৃতি ও জীবিকা। অব্যাহত নদীভাঙনে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে বরিশালের ভৌগোলিক মানচিত্র।
পরিবেশ গবেষক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে বরিশাল বিভাগের অন্তত ১২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিভাগের প্রায় ১০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ চরম ভাঙনঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং নদী থেকে অবাধে বালু উত্তোলন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বরিশালের হিজলা উপজেলার গৌরবদী ইউনিয়নের মেঘনা তীরের বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ মোল্লা (৭০)। নিজের চোখে দেখেছেন নদীর ভাঙা-গড়ার খেলা। বলেন, ‘যে মাটিতে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে, সেই মাটি আজ নদীর নিচে। পাকা ঘর, ধানিজমি, বাপ-দাদার ভিটা—সব চোখের সামনে হারিয়ে গেছে।’ একই এলাকার রাবেয়া বেগম জানিয়েছেন ভয়াবহ আশঙ্কার কথা। বলেছেন, ‘নদী যেভাবে এগিয়ে আসছে, দ্রুত কার্যকর বাঁধ না হলে একদিন পুরো ইউনিয়নই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।’
মেঘনার পাশাপাশি কীর্তনখোলা, কালাবদর, আড়িয়াল খাঁ, তেঁতুলিয়া, সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও মাসকাটা নদীতেও ভয়াবহ ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী চরবাড়িয়া এলাকায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের পরও গত বর্ষায় নতুন করে ভাঙন দেখা দেয়।
চরবাড়িয়ার বাসিন্দা আবদুল খালেক মিয়া বলেন, ‘তিনবার বাড়ি হারিয়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখন এই জায়গাটাও নদীর মুখে। আর কোথায় যাব, জানি না।’
মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নে গেলে নদীভাঙনের ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। কালাবদর, তেঁতুলিয়া, মাসকাটা ও আড়িয়াল খাঁ নদীঘেরা এই ইউনিয়নের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা গত পাঁচ বছরে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
সম্প্রতি হিজলা উপজেলার বাহেরচর ফেনুয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভাঙনের আতঙ্কে মানুষ ঘরবাড়ি খুলে সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ গাছ কেটে বিক্রি করছেন, কেউ টিন-কাঠ ও আসবাবপত্র রক্ষায় ব্যস্ত। নদীতীরে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ঢেউয়ের আঘাতে মুহূর্তেই তীরের অংশ ভেঙে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হাবিব চৌকিদার বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটা আগেই নদীতে গেছে। গত বছর দুইবার ঘর সরিয়েছি। এখন তৃতীয়বার সরানোর প্রস্তুতি চলছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে অনেক জমি নদীতে চলে গেছে।’
নদীভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর একটি বাহেরচর ফেনুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কয়েক বছর আগে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিদ্যালয় ভবনটি গত বছর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘বিদ্যালয়টি দুইবার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গত বছর তৃতীয়বারের মতো স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চালাতে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরের একটি আবাসিক ভবন ভাড়া নেওয়া হয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে সেটিও আবার সরিয়ে নিতে হবে। বর্তমানে স্কুলটিতে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোতাহার হোসেন বলেন, ‘ডোরী বাড়ি মসজিদ থেকে লক্ষ্মীরচর মকবুলের পুল পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা সম্প্রতি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে আরও অনেক স্থাপনা হারিয়ে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘কাগজে-কলমে ইউনিয়নের জনসংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। কিন্তু বাস্তবে তা অনেক কমে গেছে। প্রায় আট হাজার পরিবারের মধ্যে কয়েক হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে বিভিন্ন চরে গিয়ে নতুন বসতি গড়েছে।’
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে শ্রীপুর মহিষা ওয়াহেদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মহিষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাহেরচর বাজার, শ্রীপুর বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ অসংখ্য স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ৯১ নম্বর চর ফেনুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্রীপুর মহিষা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবন, বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র এবং শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব।
ব্যবসায়ী নাজমুল সাকিব বলেন, ‘প্রতিবছর ঘর সরানো, দোকান সরানো–এই জীবন আর ভালো লাগে না। নদী ভাঙবে, আমরা পালাব–এটাই যেন নিয়ম হয়ে গেছে।’ স্থানীয় বাসিন্দা মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ত্রাণ চাই না, নদীভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধান চাই। টেকসই বাঁধ হলে মানুষ অন্তত নিজের ভিটেমাটি রক্ষা করতে পারবে।’
পরিবেশবিদদের মতে, নদীভাঙন এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটেও রূপ নিয়েছে। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন, তলদেশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন এবং দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনার অভাব ভাঙনের মাত্রা বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় আহ্বায়ক রফিকুল আলম বলেন, ‘অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুহারা হচ্ছে। নদী ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, ‘বিভাগের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ভাঙনরোধ ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য কয়েকটি বড় প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু হবে।