সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকেই। এই দ্বন্দ্ব চলমান আছে এখনো। নেতৃত্বে আসার দৌড়ে নারী উদ্যোক্তাদের দুটি পক্ষ তৈরি হয়েছে। এক পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লুবানা ইয়াসমিন শম্পা। অন্য পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আরশি বিজনেস হাউসের পরিচালক ও মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সামিয়া বেগম চৌধুরী। এই দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। লুবানা ইয়াসমিন শম্পার পক্ষ বলছে, উইমেন চেম্বারকে দলীয়করণের অপচেষ্টা চলছে। আবার সামিয়া বেগম চৌধুরীর পক্ষের দাবি, উইমেন চেম্বারকে রাজনীতিমুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে।
সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠার পর থেকে সভাপতি ছিলেন স্বর্ণলতা রায়। একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘদিন সভাপতি পদে থাকলেও ৫ আগস্টের পরে স্বর্ণলতা রায় পদত্যাগ করে বিদেশে চলে যান। এরপর ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান উদ্যোক্তা লুবানা ইয়াসমিন শম্পা। তবে গত ১৫ ডিসেম্বর সিলেট উইমেন চেম্বারের অনির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগের আবেদন করেন সামিয়া বেগম চৌধুরীসহ কয়েকজন নারী উদ্যোক্তা। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ মার্চ সিলেট উইমেন চেম্বারে প্রশাসক নিয়োগ দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. নুরের জামান চৌধুরী উইমেন চেম্বারের দায়িত্ব পান।
নিয়োগের পর নারী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে সুষ্ঠু নির্বাচন করার লক্ষ্যে উইমেন চেম্বারের সদস্য আহ্বান করা হয়। ১৭ এপ্রিল ছিল উইমেন চেম্বারের সদস্য ফরম জমা দেওয়ার শেষ দিন। তবে ওই দিন ফরম জমাদানের সময়সীমা শেষ হওয়ার মিনিট চারেক আগে প্রশাসক আবারও ফরম জমার সময় বৃদ্ধি করে গণবিজ্ঞপ্তি দেন। এই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সাধারণ নারী উদ্যোক্তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এরপরই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন সাবেক কমিটির সহসভাপতি ও বর্তমান নির্বাচনে একটি প্যানেলের প্রধান লুবনা ইয়াসমিন শম্পা ও তার পক্ষের নারী উদ্যোক্তারা। গত ১৭ এপ্রিল রাতে তারা উইমেন চেম্বার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তারা অভিযোগ করেন, সিলেট উইমেন চেম্বারকে দলীয়করণের অপচেষ্টা চলছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পুতুল নির্বাচন করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। বিএনপি নেত্রী সামিয়া বেগম চৌধুরী এসব করাচ্ছেন।
লুবানা ইয়াসমিন শম্পা বলেন, ‘আমরা জানি, গত বুধবার পর্যন্ত ৩০০ ফরম সংগ্রহ হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার ফরম জমা দেওয়ার শেষ দিনে প্রায় ২০০ ফরম কেনা হয়েছে। একজন নেত্রী একাই ১০০ ফরম কিনেছেন। যারা ফরম নিয়েছেন তারা জানতেন সময় বাড়ানো হবে। কিন্তু আমরা সেটা জানি না। ফরম জমার সময়সীমা শেষ হওয়ার চার মিনিট আগে আবারও সময় বাড়ানো হয়েছে। তার মানে বোঝা যাচ্ছে, আগামী নির্বাচনটি একটি পুতুল নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনে আমরা কেউ অংশ নেব না। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিপক্ষকে নির্বাচনে জয়ী করতে নিয়মবহির্ভূতভাবে সদস্য বাড়ানো হচ্ছে। দলীয়করণ করতে এসব করা হচ্ছে। কিন্তু সিলেট উইমেন চেম্বার এটি একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। এখন আমাদের নারী উদ্যোক্তাদের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা হুমকি দিচ্ছেন। এখানের সদস্যরা উদ্যোক্তা কি না তা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিক থেকে আমাদের নারী উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না সাবেক মেয়র আরিফুল হকের নির্দেশে। আমরা বলতে চাই, আপনারা দলীয়ভাবে উইমেন চেম্বার নিয়ে যান, আমরা কোনো কথা বলব না। কিন্তু এই পুতুল নির্বাচন আমরা মানব না। সিলেট উইমেন চেম্বারকে দলীয়মুক্ত করতে আমার প্রয়োজনে কঠোর কর্মসূচি দেব।’
লুবানা ইয়াসমিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের সাবেক সভাপতি আওয়ামী লীগ করেছেন। তাই তিনি পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু পুরো পরিষদকে কেন আওয়ামী তকমা দেওয়া হচ্ছে। আমরা যদি আওয়ামী লীগ করতাম তাহলে ৫ আগস্টের পর আমরাও পালিয়ে যেতাম। আমরা সাধারণ ব্যবসায়ী, তাই আমার এখনো সিলেটে সগৌরবে ব্যবসা করছি। আমরা চাচ্ছিলাম যেন কোনো রাজনৈতিক ছায়া না পড়ে এখানে। কিন্তু এখন বিভিন্নভাবে এই চেম্বারকে দলীয়করণ করার জন্য রাজনৈতিক নেতারা উঠেপড়ে লেগেছেন।’
অন্যদিকে সামিয়া বেগম চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘তারা আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করছেন সেটা সম্পূর্ণ অসত্য। কেউ চাইলেও একসঙ্গে ১০০ ফরম নিতে পারবেন না। একজন উদ্যোক্তার ৫টি করে ফরম নেওয়ার নিয়ম আছে। আমিও ৫টি নিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘ওনারা এত বছর ছিলেন আর নতুনদের মাত্র ১৩ কার্যদিবস দিলেন কেন? এই সময়ের মধ্যে সবকিছু জমা দেওয়া সম্ভব না। তার ওপর টিন সার্ভার ডাউন। তারা উদ্যোক্তার ফরম জমা দিতে পারছিলেন না। তাই সময় বৃদ্ধি করার জন্য আমরা সাধারণ নারী উদ্যোক্তারা আবেদন করেছি। প্রশাসক তদন্ত সাপেক্ষে সময় বাড়িয়েছেন। এতেই তাদের সমস্যা হয়েছে।’
দলীয়করণের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষারোপ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। একজন মানুষের অনেক পরিচয় থাকতে পারে। আমার রাজনৈতিক পরিচয় আছে কিন্তু ব্যবসা আমার পেশা। এখানে রাজনীতি মেশানো যাবে না। আমরা বরং রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ আনার চেষ্টা করছি। ওনারা গায়ের জোরে ক্ষমতায় ছিলেন, এখনো থাকতে চাচ্ছেন। আমরা বলিনি আমরা নির্বাচন করব। তবে পরিবেশ সুস্থ করতে সংস্কার চেয়েছিলাম। নারী উদ্যোক্তাদের সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রশাসক নিয়োগের আবেদন আমরাই করেছিলাম। এখন বিষয়টি প্রশাসক দেখবেন। আমরা চাই নারী উদ্যোক্তারা যেন চেম্বারে আসেন। আমাদের বোনেরা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ দেখুক এটা চাই। আগের মতো যেন কেউ জোর খাটাতে না পারেন, সাধারণ নারী উদ্যোক্তাদের এটাই দাবি।’