বরিশালের মেঘনা নদী তীরবর্তী উপজেলা মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার আলিমাবাদ ইউনিয়নের গাগরিয়া গ্রামের দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকারি কলেজ। কলেজে সরকার অনুমোদিত ২২ শিক্ষক রয়েছেন। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ১৯ শিক্ষক কলেজে আসছেন না প্রায় ৯ মাস ধরে। অনুপস্থিত শিক্ষকরা সাবেক সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথের অনুসারী এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ছিলেন। বিগত দিনের কর্মকাণ্ডে জনরোষে পড়ার ভয়ে কলেজ আসছেন না। এ ছাড়া বিভাগের ছয় জেলার আরও ৯টি কলেজ ও ১৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৩৬ শিক্ষক প্রায় ৯ মাস ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অনুপস্থিত ৩৭ কলেজ শিক্ষকের মধ্যে বরিশালের তিন কলেজের ২২ জন, ভোলার চার কলেজের ছয়, পটুয়াখালীর দুই কলেজের আট এবং পিরোজপুরের একটি কলেজের এক শিক্ষক রয়েছেন। এ ছাড়া পটুয়াখালীর আটটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আটজন, ভোলার একটি প্রতিষ্ঠানে তিন, বরগুনায় দুই, বরিশালের পাঁচটি স্কুলের পাঁচজনসহ মোট ১৮ শিক্ষক কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন।
দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকারি কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল কুদ্দুস সিকদার বলেন, ‘আমি সম্প্রতি অধ্যক্ষ হিসেবে এ কলেজে যোগ দিয়েছি। কলেজে সব শিক্ষক অনুপস্থিত আছেন, সেটা ঠিক নয়। তবে বড়সংখ্যক অনুপস্থিত রয়েছেন।’ স্থানীয় ব্যক্তি ও শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতা আমলে তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। দেশের পটপরিবর্তনের পর তারা আত্মগোপনে চলে গেছেন। জনরোষে পড়ার ভয়ে কর্মস্থলে ফেরার সাহস পাচ্ছেন না। তবে এসব শিক্ষক নিয়মিত বেতন-ভাতা ঠিকই পাচ্ছেন।
এদিকে তদন্ত সাপেক্ষে কর্মস্থলের অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ইউনুস আলী সিদ্দিকী। অন্যদিকে অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বরিশাল অঞ্চলের উপপরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসাইন।
বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির বরিশাল বিভাগীয় সভাপতি অধ্যাপক মহসিন উল ইসলাম হাবুল বলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষকরা যে কত নির্যাতিত, তা কেবল তারাই জানেন। বেশির ভাগ সময়েই গভর্নিং ও ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের চক্ষুশূল হতে হয় তাদের। আবার এ কথাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিছু শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে প্রকাশ্যে জড়িয়ে পড়ার কারণে তাদের নৈতিক মনোবল হারিয়েছেন। সেই সুযোগ নিয়ে ‘মব ভায়োলেন্সের’ নামে শিক্ষকদের স্কুল-কলেজে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ চেতনায় বিশ্বাসী শিক্ষকদের কাছে রীতিমতো চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। এ জন্যই শিক্ষকরা পালিয়েছেন।’
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা, বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘গত বছরের ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বরিশাল অঞ্চলের ১০টি কলেজের ৩৭ শিক্ষক রাজনৈতিক কারণে অনুপস্থিত রয়েছেন। বারবার বলার পরও তারা কর্মস্থলে আসছেন না। কিন্তু নীতিমালার সুযোগে তারা নিয়মিত বেতন-ভাতা নিচ্ছেন। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বরিশাল অঞ্চলের উপপরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি, কিছু শিক্ষক অতীতে এমন কিছু কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকায় নিজেরাই নিজেদের নৈতিক মনোবল হারিয়েছেন। কৃতকর্মের জন্য জনরোষে বা ক্ষোভের শিকার হতে পারেন। ফলে ৫ আগস্ট থেকে তারা কর্মস্থলে উপস্থিত থাকছেন না। দীর্ঘ অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ইউনুস আলী সিদ্দিক বলেন, ‘শিক্ষকরা অনুপস্থিত থেকে বেতন তুলছেন, এটা অনিয়ম। বিগত দিনে তারা এমনই রাজনীতি করছেন যে, এখন ভয়ে তারা এলাকায় আসতে পারছেন না। দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থী। এতে পরীক্ষার ফলাফলের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যা দরকার, তা করা হবে।’