যশোরের কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল ও উপকরণ সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। অর্থোপেডিক, সার্জারি, কার্ডিও, চক্ষু বিশেষজ্ঞসহ গুরুত্বপূর্ণ ১০টি চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া ২২টি পদে নেই স্বাস্থ্য সহকারী। চালক না থাকায় অ্যাম্বুলেন্স সেবাও পাওয়া যাচ্ছে না। কমপ্লেক্সের ২০৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ৬৮টি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকটে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, যশোর-সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হওয়ায় আশপাশের উপজেলার রোগীরাও এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও মূলত ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে এর কার্যক্রম চলছে। কমপ্লেক্সে একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসারের পদ থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি), অর্থোপেডিক, কার্ডিও, চক্ষু, চর্ম ও যৌন পদসহ চিকিৎসকদের ২১ পদের মধ্যে ১০টিই শূন্য রয়েছে। নেই নার্সিং সুপারভাইজার ও প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক।
অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিকের ৩টি পদই শূন্য। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিও), স্টোরকিপার, সহকারী নার্স, কার্ডিওগ্রাফার ও কম্পাউন্ডার নেই। স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ৩৯টি পদের মধ্যে ২২টিই শূন্য। দীর্ঘদিন চালক ও জুনিয়র ম্যাকানিকের পদ শূন্য থাকায় রোগীরা অ্যাম্বুলেন্স সেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। এ ছাড়া উন্নয়ন খাতভুক্ত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারের ২৯টি পদের মধ্যে দুটি পদ শূন্য। তৃতীয় শ্রেণির ৭৮টি পদের মধ্যে ৩৬টি পদ শূন্য। এ ছাড়া চতুর্থ শ্রেণির নিরাপত্তা কর্মী, এমএলএসএস, মালী, ওয়ার্ড বয়, কুক, আয়া, ঝাড়ুদারসহ ২২ পদের ১২টিই শূন্য।
কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রোগী, তাদের স্বজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা নানা ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। কেশবপুরবাসী ছাড়াও যশোরের মনিরামপুর, সাতক্ষীরার কলারোয়া ও তালা উপজেলা থেকেও রোগী আসেন। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য রোগীদের দীর্ঘ লাইন দিতে হয়। শয্যা সংকুলান না হওয়ায় ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায় বিছানা পেতে রোগীদের চিকিৎসা নিতে হয়।
হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বহিরাঙ্গন আবর্জনায় ভরে থাকে। হাসপাতাল চত্বরে থাকা গভীর নলকূপটি নষ্ট। জেনারেটর থাকলেও তেলের অভাবে সেটি চালু করা হয় না। বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগীদের অন্ধকারে থাকতে হয়। ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন না থাকায় এখন আর কেউ হাসপাতালে এক্স-রে করতে আসেন না।
কথা হয় সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার দেয়াড়া গ্রামের সোহেলী আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কেশবপুর সরকারি হাসপাতালটি আমাদের কাছে হয়। এ জন্য কলারোয়া না গিয়ে এখানে আসি। সকাল ১০টায় এসে দুপুর সাড়ে ১২টায় ডাক্তার দেখাতে পেরেছি। ডাক্তার রক্তের পরীক্ষা দিয়েছেন। তবে নার্স দেখে বলেছেন, এই পরীক্ষা এখানে হয় না। যে পরীক্ষা আমি হাসপাতালে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় করাতে পারতাম সেটা আমাকে বাইরে থেকে ৮০০ টাকায় করাতে হয়েছে।’
কেশবপুর সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নেই বললেই চলে দাবি করে স্থানীয় হাসপাতাল পাড়ার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা মারামারিতে সামান্য আহত হয়ে হাসপাতালে এলেও রোগীকে জেলা সদর বা খুলনায় রেফার করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসক নেই, জনবলও নেই। কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যার হলেও এখানে সব সময় বেশি রোগী ভর্তি থাকে। এতে শয্যার অভাবে অধিকাংশকেই মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়।’
শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া কেশবপুরের পাঁজিয়া গ্রামের আবদুল কাদের বলেন, ‘শৌচাগারের দরজা খুললেই দুর্গন্ধ বের হয়।’ বারান্দায় চিকিৎসা নেওয়া কেশবপুরের জাহানপুর গ্রামের আবদুল গণি বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্যান-বাতি বন্ধ হয়ে যায়, তখন খুবই কষ্ট হয়।’ আরেক রোগী মজিবর রহমান বলেছেন, ‘হাসপাতালে বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। নলকূপটি নষ্ট। দূর থেকে পানি আনতে হয়।’
জনবল ও উপকরণ সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে গড়ে প্রতিদিন ৩৫০ এর বেশি এবং জরুরি বিভাগে ৪০ জন সেবা নেন। এ ছাড়া ৯০ এর বেশি রোগী ভর্তি থাকনে।
তিনি বলেন, ‘দেড় বছর ধরে অ্যাম্বুলেন্সের চালক নেই। আমার গাড়ির চালক দিয়ে জরুরি প্রয়োজন মেটানো হয়। জেনারেটর আছে কিন্তু তেলের বরাদ্দ না থাকায় সেটি চালানো যায় না। গভীর নলকূপটিতে এক বছর ধরে পানি উঠছে না। অন্যদিকে ছয়জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বিপরীতে মাত্র দুজন কর্মরত আছেন। তাদের দিয়ে পুরো হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন। এসব বিষয় ও জনবল সংকটের কথা আগেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছি। আবারও জানাব।’