নগরের খাল-নালার উন্মুক্ত ৫৬৩ স্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই নগরের কোথাও না কোথাও ঘটছে প্রাণহানি। এসব স্থানে ঝুঁকি এড়াতে এবং মৃত্যু ঠেকাতে সিটি করপোরেশন তৈরি করেছে বাঁশের নিরাপত্তাবেষ্টনী। এই পদক্ষেপকে ‘লোক দেখানো’ বলে দাবি করছেন নগরবাসী। এদিকে দুর্ঘটনা কমাতে স্থায়ী সমাধানের বিকল্প নেই বলে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হলেই স্থায়ীভাবে ঝুঁকিমুক্ত করা সম্ভব বলে জানিয়েছে চসিক।
মঙ্গলবার (২৭ মে) নগরের কাপাসগোলা, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঝুঁকি এড়াতে অধিকাংশ অনিরাপদ জায়গায় বাঁশের বেড়া দিয়েছে সিটি করপোরেশন। আবার বন্দর এলাকায় খালের পাশে কোনো বেষ্টনী দেখা যায়নি। আগ্রাবাদ, জিইসি, হালিশহরের আনন্দবাজার এলাকার কোনো কোনো স্থানে নালার ওপর স্ল্যাব নেই। আবার নগরের সিআরবি, লালখানবাজার, আলমাস সিনেমা হলসহ বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে উন্মুক্ত ম্যানহোল। এতে করে হাঁটতে গিয়ে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম শহরজুড়ে নালা-খালের পরিমাণ দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি। এসব নালা-খালে পড়ে কোনো ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটলে তোড়জোড় বেড়ে যায় প্রশাসন কিংবা সিটি করপোরেশনের। কিন্তু কিছুদিন পর আবার তা থেমে যায়। সিটি করপোরেশনের বাঁশের বেড়া কতটা কার্যকর এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
নগরের হালিশহর এলাকার বাসিন্দা নুরুল করিম বলেন, ‘বর্ষাকালে কোমরসমান পানি হয়। তখন চলাফেরায় অসুবিধা হয়। বাঁশের বেড়া দিয়ে এই নগরবাসীর জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না। এগুলো সাধারণ মানুষের সঙ্গে তামাশা করা ছাড়া কিছুই না।’
কাপাসগোলা এলাকার মো. শফিউল বলেন, ‘গত মাসে হিজড়া খালে ছয় মাসের একটা শিশু মারা গেল। এরপরই উন্মুক্ত খালে বসানো হলো বাঁশের বেড়া (বেষ্টনী)। কিন্তু এটা তো কোনো সমাধান হলো না। কারণ ঝড় হলে বাঁশের বেড়া নষ্ট হতে পারে। আর কত মৃত্যু হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে। আমরা এখনো জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচতে পারিনি। আমরা চাই সিটি করপোরেশন একটি কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।’
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাবেক প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতিটি খালের প্রাকৃতিক প্রশস্ততা আমরা সংরক্ষণ করতে পারিনি। আমরা সব সময় পলিথিনসহ বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা ফেলে খালের ওপর অত্যাচার করছি। খালে পলি জমতে দেওয়া যাবে না। এ দিকটায় নজর দিতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য বাঁশের বেড়া দেওয়াটা মোটেই সমীচীন নয়। এটা তো সমাধানের পথ নয়। নিতে হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ। যাতে করে স্থায়ী সমাধান মেলে।’
বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য বাঁশের বেষ্টনী হলো মন্দের ভালো উদ্যোগ। একসময় কিছুই ছিল না। বিভিন্ন খাল নালায় সাধারণ মানুষ পড়ে মারা যাচ্ছিল। এ জন্য কেউ ক্ষতিপূরণও পায়নি। এখন অন্তত বাঁশের বেষ্টনী দেওয়া হলো। তবে এটি শহরবাসীকে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত করবে না। কারণ চট্টগ্রাম শহরের অনেক জায়গায় এত বেশি পানি জমে, যেখানে বাঁশের বেষ্টনী ডুবে যাবে। তা ছাড়া কিছু এলাকা সন্ধ্যার পর অন্ধকার থাকে। সেসব এলাকায় রাতে বাঁশের বেষ্টনী দেখা যাবে না। ঝুঁকিমুক্ত করতে চাইলে প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লাল সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সতর্কবার্তা লিখে দেওয়া উচিত। ওই পথে চলার সময় মানুষ সাইনবোর্ড দেখে সতর্ক হবে। তাতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কিছুটা হ্রাস পাবে।’
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে খাল পুনঃখনন, খাল সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় আপাতত স্থায়ী প্রাচীর দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে চসিক কর্তৃপক্ষ। চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা তো সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ২৭ বছর ধরে কেউ বক্স কালভার্ট নিয়ে ভাবেনি। পরিষ্কার করেনি। সেখানে আমরাই সেটা পরিষ্কারের উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে কাজও শুরু হয়ে গেছে। যেহেতু আমাদের খালের সংস্কারকাজ এখনো শেষ হয়নি, তাই আমরা অস্থায়ী ভিত্তিতে নিরাপত্তার জন্য বাঁশের বেষ্টনী দিয়েছি। সংস্কারকাজ সম্পন্ন হলে তখন স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা করা হবে।’
নালায় পড়ে যত মৃত্যু
২০১৫ সালে নগরের আগ্রাবাদ সিঅ্যান্ডবি কলোনির পাশে বিলাপাড়া নাসির খালে সিএনজি অটোরিকশা পড়ে মারা যান যাত্রী ফিরোজ জামান খান ও চালক মাহবুবুর রহমান। ২০১৮ সালের ৯ জুন নগরের আমিন জুট মিল এলাকায় নালায় পড়ে মারা যান আল আমীন নামে সাত বছরের এক শিশু। তবে নালা ও খালে পড়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ২০২১ সালে। ২০২১ সালের ৩০ জুন নগরীর ২ নম্বর গেট এলাকায় চশমা খালে অটোরিকশা থেকে নালায় পড়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুলতান ও যাত্রী খাদিজা বেগম (৬৫) মারা যান। একই বছরের ২৫ আগস্ট মুরাদপুর মোড়ে বৃষ্টির মধ্যে নালায় পড়ে নিখোঁজ হন সবজি বিক্রেতা সালেহ আহমেদ। ওই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর আগ্রাবাদ এলাকায় নালায় পড়ে মারা যান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সেহেরীন মাহবুব সাদিয়া। একই বছরের ৬ ডিসেম্বর ষোলশহর এলাকায় খেলতে গিয়ে নালায় পড়ে মারা যায় ছয় বছরের শিশু মোহাম্মদ কামাল।
২০২২ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া থানার কল্পলোক আবাসিক এলাকার ৫ নম্বর ব্রিজের নিচে খেলা করার সময় খালের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালের ৭ আগস্ট পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে কলেজছাত্রী নিপা পালিত জলাবদ্ধ সড়কের পাশে ড্রেনে পড়ে মারা যান। ২৭ আগস্ট আগ্রাবাদের রঙ্গীপাড়া এলাকায় দেড় বছর বয়সী শিশু ইয়াছিন আরাফাত নালায় পড়ে মারা যায়। ওই বছরের ২৯ আগস্ট বাকলিয়ায় এক মাদ্রাসাছাত্র খালে পড়ে মারা যায় এবং হালিশহরের মহেশখালে এক শিশু মারা যায়।
২০২৪ সালের জুনে নালায় পড়ে স্রোতে তলিয়ে যায় সাইদুল ইসলাম নামে সাত বছরের এক শিশু। পরের দিন নাছির খালে তার লাশ পাওয়া যায়। সবশেষ চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে নগরের কাপাসগোলা এলাকায় হিজড়া খালে নিখোঁজ হয় ছয় মাসের শিশু সেহরিশ। গত ১৯ এপ্রিল সকাল ১০টার দিকে নগরের চাক্তাই খাল থেকে উদ্ধার করা হয় শিশুটির নিথর দেহ।