দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা ও মা-বাবার নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নিজের প্রচেষ্টায় এ বছর মাধ্যমিকে ঢাকা বোর্ড থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ইমরান।
জেলার শিবচর উপজেলার মাদবরেরচরের রহিম উদ্দিন মাদবর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। তার এই কৃতিত্বে শিক্ষক ও এলাকাবাসী খুশি হলেও পরিবারে এখন আনন্দের পরিবর্তে দুশ্চিন্তা যেন সঙ্গী হতে চলেছে। অর্থের অভাবে ইমরানের উচ্চশিক্ষা নিয়ে চিন্তিত সবাই।
উপজেলার মাদবরেরচর ইউনিয়নের ডাইয়ারচর গ্রামের অটোচালক আবু কালাম মিনা ও গৃহিণী হামিদা বেগম দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান ইমরান। সারাদিন অটো চালিয়ে বাবা আবু কালাম মিনা যে টাকা উপার্জন করেন সেটা দিয়ে সংসার চালাতেই শেষ হয়ে যায়।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী ইমরান। তার বড় ভাই হাসান স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়েন। আর ছোট বোনটি পড়েন প্রথম শ্রেণিতে। ছোটবেলা থেকেই পড়ার প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল ইমরানের। নিয়মিত বিদ্যালয়ে ক্লাস করতেন আর শিক্ষকদের পরামর্শ নিত নিয়মিত। এখন ভালো কোনো কলেজে ভর্তি ও পড়ালেখায় প্রয়োজনীয় টাকা তার দিনমজুর বাবার পক্ষে জোগান দেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য ইমরান এক ধরনের অনিশ্চয়তা নিয়ে এখন দিন পার করছে বলে জানা গেছে।
তবে পরিবারের লোকজন জানান, ইমরানকে অনেক দূর পড়াশোনা করার স্বপ্ন তাদের আগে থেকেই ছিল। সেটাই করার চেষ্টা করেছেন তারা। ইমরানের পড়াশুনার আগ্রহ ও এবারের এসএসসির রেজাল্ট দেখে তারা ইমরানকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন । তবে যখন তারা জানতে পেরেছেন এরপরে ছেলের উচ্চ শিক্ষা নিতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন হবে, তখন থেকেই তাদের মনটা খুবই খারাপ হয়ে আছে। আসলে তাদের পক্ষে অনেক টাকা খরচ করে ওকে পড়াশোনা করানো সম্ভব নয়। তাই সরকারসহ সবার সহযোগিতা চান তারা।
ইমরান বলেন, আসলে পড়াশোনা নিজের ব্যাপার। যদি নিয়মিত পড়াশোনা করা যায় আর শিক্ষকদের পরামর্শ নেওয়া যায় তাহলে কোনো কিছুই বাধা হয় না। আমার এই ফলাফলের পেছনে প্রথমে আমার মা পরে আমার বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবদান। শিক্ষকরা কখনো আমার বেতন নেননি। আমার বাবা অটোচালক। তিন ভাইবোন আমরা। সংসার চালিয়ে আমাদের পড়াশোনা করাতে বাবার অনেক কষ্ট হয়।আমি চাই সামনে আরও ভালো পড়াশোনা করে বুয়েটের ভর্তি হতে। প্রকৌশলী হবার ইচ্ছে আমার। তাই আমি সরকারসহ সমাজের সবার সহযোগিতা চাই।
ইমরানের মা বলেন, আমার ইমরান খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। কোনোদিন স্কুলে থেকে এসে দেখছে ভাত রান্না হয়নি, সে কিন্তু ভাত না খেয়েই আবার স্কুলে চলে গেছে। পরে এসে ভাত খেয়েছে। পড়ায় কখনো ফাঁকি দেয়নি। ওর স্কুলের শিক্ষক ও মামাদের সহযোগিতায় আজ সে এই ফল করেছে। আমরা আত্মীয় স্বজনেরা সবাই খুশি। সামনে যে আবার ভালো কলেজে ভর্তি হবে, সেখানে অনেক টাকা খরচ হবে। এটা নিয়ে আমরা চিন্তিত। ওর পাশে আপনারা থাকবেন।
মাদবরেরচর রহিম উদ্দিন মাদবর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মোতালেব শিকদার বলেন, ২০২৫-এর এসএসসি পরীক্ষায় ইমরান জিপিএ ৫ পেয়েছে। সে একজন গরিব পরিবারের সন্তান। সে আগাগোড়াই একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সে কখনো সেকেন্ড হয়নি। প্রথমই হয়েছে। তার লেখাপড়ার বিষয় আমাদের সব শিক্ষকই সার্বিক সহযোগিতা করেছে। তার আচার আচরণে আমরা মুগ্ধ ছিলাম। যেহেতু সে গরিব পরিবারের সন্তান সমাজের সবার কাছে আবেদন তারা যেন তার পাশে দাঁড়ান। আমি তার সার্বিক মঙ্গল কামনা করি।
রফিকুল ইসলাম/সুমন/