গত বছরের ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান বরিশালের বানারীপাড়ার পূর্ব সলিয়াবাকপুর গ্রামের জসীম উদ্দিন। এ ঘটনার পর থেকে তার স্ত্রী সুমী আক্তার এখনো নির্বাক। চোখের পানিও শুকায়নি। এ দিকে ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে তার কপালে। জুলাইযোদ্ধা শহিদ জসীম উদ্দিনের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস চাখার ওয়াজেদ মেমোরিয়াল উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। ছেলে সাইফের বয়স তিন বছর। জসীমের অপর তিন ভাই থাকেন ঢাকা ও চট্টগ্রামে। ২০২২ সালে তার বাবা আবদুল মান্নান হাওলাদার মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরেছিলেন জসীম উদ্দিন।
বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) বানারীপাড়ার পূর্ব সলিয়াবাকপুর গ্রামে জসীম উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার স্ত্রী, মেয়ে ও মায়ের সঙ্গে। বাড়ির দরজায় নক করতেই জীর্ণ-শীর্ণ শরীর নিয়ে দরজা খোলেন জসীম উদ্দিনের মা মেহেরুন্নেছা বেগম। তার চোখ-মুখ থেকে এখনো শোকের ছায়া কাটেনি। ছেলে সম্পর্কে জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে। এখন বেঁচে আছি মাত্র। প্রতিদিন জসীমের ফোনের অপেক্ষায় থাকি কিন্তু কোনো ফোন আসে না।’
কথা বলতেই ছোট একটি নিশ্বাস ছেড়ে সুমি আক্তার বলেন, ‘যা হারিয়েছি, সেটা তো আর ফিরে পাব না। তার (জসীম উদ্দিনের) ইচ্ছা ছিল ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করার। তার সে ইচ্ছা পূরণের যুদ্ধে আছি। কিন্তু বাবা হারানো সন্তানদের নিয়ে একা এই যুদ্ধ কীভাবে মোকাবিলা করব বুঝতে পারছি না। ছেলে-মেয়ে বড় হচ্ছে, খরচও বাড়ছে। জুলাই ফাউন্ডেশন ও সরকারি সহায়তার জমানো টাকা দিয়ে সংসারের খরচ ও মেয়ের পড়াশোনা করাতে হিমশিম খাচ্ছি।’
জসীম উদ্দিন কেমন মানুষ ছিলেন জানতে চাইলে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন সুমি আক্তার। এ সময় তার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল। কিছুটা নীরবতা ভেঙে তিনি বলেন, ‘আমাদের সুখের সংসার ছিল। তার মতো ভালো মানুষ আর হয় কি না আমার জানা নেই। পরিবারের সবাইকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন। ১৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে তিনি কখনো আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেননি। কখনো কোনো বিষয় নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি হয়নি। তিনি শহিদ হওয়ার পর থেকে মেয়ের মনের মধ্যে কেমন যেন ঝড় বয়ে চলছে। প্রায়ই বাবার কবরের পাশে গিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করে সে। ছেলে এখনো বাবাকে খুঁজে বেড়ায়।’
বাবার স্মৃতিচারণ করে জান্নাতুল বলে, ‘সব সময় বাবা ভালো করে পড়াশোনা করতে বলতেন। মানুষের মতো মানুষ হয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর কথা বলতেন। যেদিন বাবা মারা গেছেন, ওই দিন দুপুরে তার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল, বলেছিলেন স্কুল থেকে ফেরার পথে দাদির জন্য ফল নিয়ে আসতে। এরপর বাবার সঙ্গে আর কথা হয়নি।’
গত বছরের ১৮ জুলাই দুপুরে রাজধানীর উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরে কোটা আন্দোলনকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান জসীম উদ্দিন। ওই দিন রাতেই গ্রামের বাড়িতে তার লাশ নিয়ে আসা হয়। পরের দিন ১৯ জুলাই সকালে বাড়ির পাশে পারিবারিক কবরস্থানে তার বাবার কবরের পাশে জসীম উদ্দিনকে দাফন করা হয়।