কালভার্টটি বানানো হয়েছে অনেক আগে। টেন্ডার প্রক্রিয়ার সব কিছুই স্বাভাবিক। বরাদ্দের টাকাও তোলা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের রেজিস্ট্রারে পুরো কার্যক্রম লিপিবদ্ধ রয়েছে। কাগজে-কলমে তথ্যের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। প্রকল্প যেখানে হওয়ার কথা ঠিক সেখানে গিয়ে কোনো কালভার্টের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি!
অভিযোগ উঠেছে, কাজ না করে পুরো টাকাই আত্মসাৎ করা হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, সেখানে থাকা ‘হাজী বাড়ি’কে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ‘রাজাকারের বাড়ি’ উল্লেখ করে কালভার্টটি বানাতে দেননি। ওই টাকা তিনি আত্মসাৎ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার রায়শ্রী দক্ষিণ ইউনিয়নের বেরনাইয়া এলাকায় ২০২১-২২ অর্থবছরে একটি কালভার্ট বানানোর জন্য দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পের নাম ছিল ‘বেরনাইয়া কামালের বাড়ির সামনে কালভার্ট নির্মাণ’। ইউনিয়ন পরিষদের সম্পদ রেজিস্ট্রারে এটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পরিচিতি নম্বর ০১২০২২৩১৬। এডিপির অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা সেখানে উল্লেখ রয়েছে।
কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের বিষয়ে হাজী বাড়ির বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিদ্দিকুর রহমানের ছেলে হাবিবুর রহমান কামাল বলেন, ‘আবু হানিফ যখন আমাদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন তখন তার কাছে আমরা একাধিকবার গিয়েছে। আমাদের বাড়ির সামনে একটি কালভার্ট বানাতে অনুরোধ করেছি। ২০২১-২২ অর্থবছরে যখন চেয়ারম্যানের মেয়াদকাল শেষের পথে, ঠিক তখন প্রকল্পটি অনুমোদন পায়।
তিনি বলেন, “ওই সময় নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডা. আ. রাজ্জাক। কিন্তু তিনি আমাদের বাড়িকে ‘রাজাকারের বাড়ি’ উল্লেখ করে কালভার্টটি আর নির্মাণ করেননি। বিষয়টি নিয়ে আমি স্থানীয় ইউপি সদস্য, সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য ও স্থানীয় অনেকের কাছে গিয়েছি। তাদের মাধ্যমে কাজটি করানোর অনুরোধ করা হলে চেয়ারম্যান কালভার্ট বানাবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন।
হাবিবুর রহমান কামাল বলেন, ‘আমার বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। অথচ মুক্তিযোদ্ধার বাড়িকেই চেয়ারম্যান রাজাকারের বাড়ি বলে অপমান করেছেন। পরে জানতে পারি তিনি কালভার্টের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আমি তার শাস্তি দাবি করছি।
ওই এলাকার বাসিন্দা সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শুনেছিলাম বেরনাইয়া হাজী বাড়ির সামনে একটি কালভার্টের অনুমোদন হয়েছে। পরে কী কারণে, কেন সেটি করা হয়নি তা বলতে পারবো না। শুনেছি কাগজে-কলমে প্রকল্প ঠিকঠাক হয়েছে জানিয়ে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
নির্বিঘ্ন যাতায়াতের জন্য কালভার্টটি প্রয়োজন জানিয়ে হাজী বাড়ির আরেক বাসিন্দা নাছিমা আক্তার বলছেন, ‘এক চেয়ারম্যান থাকার সময় যে কাজের অনুমোদন হয় সেটি অন্য চেয়ারম্যানের বাস্তবায়ন না করাটা খুবই দুঃখজনক। কী কারণে কাজটি হয়নি সেটিও অফিশিয়ালি নিশ্চিত করা হয়নি।
বেরনাইয়া এলাকার সোহাগ, মিজানসহ আরও কয়েকজন বিষয়টি নিয়ে খবরের কাগজের প্রতিবেদকের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা চেয়ারম্যান বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবুল বাসার বলেন, ‘আমি প্রথমবার ইউপি সদস্য হয়েছি। আমার কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি সম্পর্কে চেয়ারম্যান ভালো বলতে পারবেন।
রায়শ্রী দক্ষিণ ইউনিয়নের পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু হানিফ বলেন, ‘আমার মেয়াদকালে কালভার্টটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হওয়ায় স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমি প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছিলাম। শুনেছি পরে নির্বাচিত চেয়ারম্যান কাজটি করেননি। কেন করেননি সেটার উত্তর উনিই ভালো দিতে পারবেন।
রায়শ্রী দক্ষিণ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হওয়ার পর শুনেছি সেখানে এডিপির টেন্ডার প্রক্রিয়ার একটি কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্প রয়েছে। আমার ধারণা, পরবর্তী সময়ে উপজেলাকে অবগত করে প্রকল্পটি সেখান থেকে বাতিল করে ইউনিয়নের অন্য কোনো ওয়ার্ডে হস্তান্তর করেছি, যা আমাদের রেজল্যুশনে থাকতে পারে।’ কোন ওয়ার্ডে কাজটি করা হয়েছে এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। এমনকি ‘অনেক আগের কাজ’ এমন অজুহাত দেখিয়ে তিনি রেজল্যুশনও দেখাতে পারেননি।
তখন তিনি বলেন, ‘হয়তো কোথাও ভুল হতে পারে। যদি আমি দায়িত্বে থাকি তাহলে আরও বেশি বাজেট দিয়ে সেখানে একটি কালভার্ট করে দেব। রাজাকারের বাড়ি বলার অভিযোগটি সত্য নয়।