সকাল ৮টা পেরোতেই রাজশাহীর আকাশে সূর্যের তীব্রতা জানান দিতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই তাপ যেন রূপ নেয় আগুনঝরা দাবদাহে।
দুপুরে নগরীর রাস্তাঘাট, ফুটপাত ও খোলা জায়গাগুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। বাতাসে নেই কোনো স্বস্তি, বরং গরম হাওয়ার ঝাপটা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে অস্বস্তি। কয়েকদিন ধরে চলা তাপপ্রবাহে রাজশাহীর জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন শ্রমজীবী, নিম্নআয়ের ও ছিন্নমূল মানুষ।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিন ধরে জেলার তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। শুক্রবার (৫ জুন) বিকেল ৩টায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ দশমিক ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বুধবার তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে কম আর্দ্রতা ও গরম বাতাসের কারণে অনুভূত তাপমাত্রা আরও বেশি মনে হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তরাঞ্চলের শুষ্ক আবহাওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টির অনুপস্থিতি এ পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
সরেজমিনে নগরীর সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, শিরোইল বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দুপুরের পর মানুষের চলাচল কমে গেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। যারা বের হচ্ছেন, তারা ছাতা, টুপি, গামছা বা কাপড় দিয়ে মাথা ও মুখ ঢেকে চলাফেরা করছেন।
তবে জীবিকার তাগিদে থেমে থাকার সুযোগ নেই দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের। নগরীর শিরোইল বাস টার্মিনালে রিকশাচালক মফিজুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, এই রোদে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। হাত-পা ঝলসে যাওয়ার মতো অবস্থা। কিন্তু কাজ না করলে সংসার চলবে না। তাই কষ্ট হলেও রাস্তায় বের হতে হচ্ছে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান দিনমজুর আশিক ও রায়হান। তারা বলেন, সকালে কাজের সন্ধানে বের হলেও দুপুরের দিকে কাজ করা কঠিন হয়ে যায়। রোদে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে মাথা ঘোরে। তারপরও পরিবারের কথা ভেবে কাজ করতে হচ্ছে।
প্রচণ্ড গরমে নগরীর বিভিন্ন মোড়ে ডাব, আখের রস, তালের শাঁস ও শরবতের দোকানে মানুষের ভিড় বেড়েছে। তৃষ্ণা মেটাতে অনেকে এসব পানীয় পান করছেন। বিক্রেতারা বলছেন, গত কয়েকদিনে তাদের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নগরীর লক্ষ্মীপুর মোড়ে একটি শরবতের দোকানে কথা হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি এক রোগীর স্বজন মো. আমজাদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রোগীর জন্য ওষুধ ও খাবার কিনতে বারবার বাইরে আসতে হচ্ছে। তীব্র গরমে হাঁটাহাঁটি করা খুবই কষ্টকর। একটু স্বস্তির আশায় শরবত খেতে এসেছি'।
তাপপ্রবাহের প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থী, পথচারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবনেও। অনেক দোকানদার জানিয়েছেন, দুপুরের পর ক্রেতার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এতে ব্যবসায়ও প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে, খোলা আকাশের নিচে কাজ করা নির্মাণশ্রমিক ও পরিবহন শ্রমিকদের কষ্ট বেড়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্মকর্তা ও মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘এই সময়ে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়াই ভালো। বাইরে বের হলে ছাতা ব্যবহার করতে হবে, পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে এবং তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে। কেউ যদি অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা অনুভব করেন, তাহলে দ্রুত ছায়াযুক্ত স্থানে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।’
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী কয়েকদিন বৃষ্টির সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে দাবদাহ অব্যাহত থাকতে পারে। মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় এবং গরম বাতাসের প্রভাবে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বৃষ্টি না হলে উত্তরাঞ্চলে তাপপ্রবাহের বিস্তৃতি আরও বাড়তে পারে। এতে জনদুর্ভোগও বাড়বে।’