চট্টগ্রাম- কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার ৪৪ কিলোমিটারে এক মাসে ২২টি দুর্ঘটনায় ২৭ জন যাত্রী ও পথচারীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক। সড়কের পাশঘেষে যত্রতত্র হাটবাজার এবং সড়কের দুইপাশের জায়গা দখল করে অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। এছাড়া মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে রয়েছে শতাধিক আঁকাবাঁকা বিপজ্জনক বাক। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম মহাসড়কে যানবাহন চলাচল চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
শঙ্কার বিষয় হলো, এই মহাসড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছেই। এসব দুর্ঘটনার শিকার হয়ে নিভে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের জীবন প্রদীপ। এতো মৃত্যুর দায় নেবে কে?
হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসে চট্টগ্রাম- কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার ৪৪ কিলোমিটার অংশে অন্তত ২২টি ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে।
কক্সবাজার সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের জন্য স্থানভেদে ৬০ থেকে ১০৪ ফুট পর্যন্ত জমি অধিগ্রহণ করা হলেও দুই লেনের মূল সড়কটি ২৪ ফুটের। সড়কের দু-পাশে অবশিষ্ট সব জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। চকরিয়ার আজিজনগর থেকে ডুলাহাজারা পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার সড়কে ৫৯৩টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। ৩৫০ দখলদারকে সরে যাওয়ার চিঠি দেওয়া হয়েছে। না গেলে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে পুনরুদ্ধার করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক বিভাগের কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ১৫৫ কিলোমিটার অংশে শতাধিক বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে। ‘মৃত্যুফাঁদ’ হয়ে থাকা বাঁকগুলো এতই বাঁকানো যে একদিক থেকে গাড়ি চলাচল করলে অন্যদিক দেখা যায় না। সামান্য অসতর্কতায়ই ঘটে যায় দুর্ঘটনা। এ ধরনের দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণে গঠিত চকরিয়া উপজেলা কমিটির সভাপতি ও চকরিয়া আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট লুৎফুর কবির বলেন, ‘চট্টগ্রাম- কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া অংশে সড়ক দুর্ঘটনা যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী। প্রতিদিন কোন না কোন স্থানে দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে অকালে জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। এখন জনগণের প্রাণের দাবিই হলো এই মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীত করা এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা।’
স্থানীয়রা জানান, মহাসড়ক ছয় লেন না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ ঢাকা, চট্টগ্রামের পাশাপাশি সারাদেশ থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। দুই লেনের কারণে তীব্র যানজট এবং সংকোচিত সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
স্বরাষ্ট্র হাইওয়ে থানার কর্মকর্তারা জানান, গত এক মাসে মালুমঘাট হাইওয়ে থানার আওতাধীন (চকরিয়া দক্ষিনাঞ্চল ফাঁসিয়াখালী থেকে খুটাখালী নতুন অফিস পর্যন্ত) এলাকায় ১২টি দুর্ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিরিঙ্গা হাইওয়ে থানার আওতাধীন (চকরিয়ার উত্তরাঞ্চল, পৌরশহর থেকে উত্তর হারবাং আজিজনগর পর্যন্ত) এলাকায় ১০টি দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত হয়েছে। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
চালকরা জানান, মহাসড়কে প্রতিদিন লবণভর্তি ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান চলাচল করে। লবণ থেকে গলে পড়া পানি সড়ককে পিচ্ছিল করে তোলে। ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানায়, অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্সবিহীনচালক এবং মহাসড়কের অব্যবস্থাপনা সবকিছুই দুর্ঘটনার মূল কারণ। লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ অনেক যানবাহনের লাইসেন্স নেই, যন্ত্রাংশ নষ্ট, চালকের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। দুর্ঘটনার পর এসব যানবাহনের চালক পালিয়ে যায়। আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় সড়ক আরও বিপজ্জনক হয়েছে।
প্রতিটি দুর্ঘটনার বিচারিক তদন্ত হওয়া জরুরি, যাতে দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা যায়। মহাসড়কে চলাচলরত সব যানবাহনের বৈধতা যাচাই, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স নিশ্চিতকরণ এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
গত ৫ নভেম্বর চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী ঢালা এলাকায় বেপরোয়া গতির যাত্রীবাহী মারসা বাস ও নোহা মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার একই পরিবারের ৫ সদস্য নিহত হয়েছেন।
রাজু দাশ/রিফাত/