‘প্রতিদিন কাজ করে সংসার চালাতে হয়। জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এলাকায় তেমন কাজ পাওয়া যায় না। এ দুই মাস পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে থাকতে হয়। এক দিন কাজ না পেলে অনেকটা না খেয়ে থাকতে হয়। তাই কাজের জন্য ঈশ্বরদীতে এসেছি। এখানে ১৫ থেকে ২০ দিন ধান লাগানোর কাজ হতে পারে। এরপর কাজের সন্ধানে অন্য কোথাও যেতে হবে।’
গতকাল মঙ্গলবার ট্রেন থেকে পাবনার ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে নামা শ্রমিক মহির উদ্দিন খবরের কাগজকে এসব কথা বলেন। মহির উদ্দিন এসেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর এলাকা থেকে।
মাহির উদ্দিনের মতো প্রতিদিন দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলা থেকে অসংখ্য শ্রমিক ট্রেনে ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে আসেন। কেউ কেউ আবার বাসেও আসেন। তাদের বেশির ভাগ কাজের সন্ধানে পাবনার বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েন। বাকিরা রাজধানী ঢাকা, কেউ চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে যান। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে আসে রহনপুর থেকে ছেড়ে আসা মহানন্দা এক্সপ্রেস ট্রেন। সেই ট্রেন থেকে নামা দুই-তিনজনের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ট্রেনটি স্টেশনে থামার পর অনেক যাত্রী নামেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই কাজের সন্ধানে আসা দরিদ্র বেকার মানুষ। লুঙ্গি পরিহিত প্রায় সবার হাতে ব্যাগ, মাথায় সাদা রঙের প্ল্যাস্টিকের বস্তা। এসব ব্যাগ, বস্তার মধ্যে রয়েছে দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য নানান কাপড়।
জানা যায়, দরিদ্র এসব বেকার মানুষ পাবনার ঈশ্বরদী, বেড়া, সাঁথিয়া উপজেলায় কৃষি কাজের জন্য বিশেষ করে বোরো ধান লাগানোর কাজে যুক্ত হবেন। তারা ৮ থেকে ১০ জনের গ্রুপে এবং কৃষকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ধান লাগানোর কাজ করবেন।
ট্রেন থেকে নামার পর বাঘা উপজেলার আড়ানী এলাকার শ্রমিক তারেক মিয়া বলেন, সারা বছর কাজ করে সংসার চালাই। নিজ এলাকায় কাজ না থাকলে এলাকার বাইরে যেতে হয়। প্রতি বছর এ সময় ঈশ্বরদীতে আসি ধান লাগানোর জন্য। প্রতিদিন কাজ শেষে ৬০০ টাকা মজুরি পাই। এ দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে।
দিনাজপুরের শ্রমিক আপিল উদ্দিন বলেন, শুধু ঈশ্বরদী নয়, রেলস্টেশন থেকে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাসযোগে অনেকে পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়ায় যাবেন কাজের জন্য। তারা সেখানেও ধান লাগানোর কাজ করবেন। আমরা দল বেঁধে ঈশ্বরদী, পাবনায় ধান লাগানোর কাজে আসি। ধান লাগানো শেষ হলে কাজের জন্য আবার অন্য কোথাও চলে যাই। সারা বছর এভাবেই আমাদের জীবন কাটে।
ঈশ্বরদী পৌর এলাকার সাঁড়া গোপালপুর গ্রামের কৃষক জয়নাল প্রামাণিক বলেন, ঈশ্বরদীতে কৃষি শ্রমিকের অভাব। যা পাওয়া যায়, তাতে কাজ শেষ করা যায় না। এ জন্য বাইরে থেকে শ্রমিক দিয়ে বোরো ধান লাগানোর কাজ শেষ করা হয়।
তিনি জানান, বোরা ধান লাগানোর জন্য জমি প্রস্তুতের কাজ চলছে। ছয়-সাত দিন পর ধান লাগানো শুরু হবে। রাজশাহীর বাঘা থেকে আসা ৬ জন শ্রমিককে এ কাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিদিন প্রত্যেককে ৬০০ টাকা নগদ পারিশ্রমিক ও এক বেলা খাবার দেওয়া হয়।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ মৌসুমে উপজেলায় ২ হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। উপজেলার সাত ইউনিয়নের মধ্যে দাশুড়িয়া, মুলাডুলি ও পৌর এলাকায় বোরো ধানের আবাদ বেশি।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুজন কুমার রায় জানান, ঈশ্বরদী ইপিজেড ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে উপজেলায় কৃষি কাজের শ্রমিকের অভাব রয়েছে। এখন বোরো ধান লাগানোর মৌসুম চলছে। এ সময় কৃষকরা রহনপুর, আমনুরা, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা শ্রমিকদের দিয়ে কৃষি শ্রমিকের ঘাটতি পূরণ করেন। ধান লাগানোর কাজে তারা তাদের ব্যবহার করবেন।