ভাঙনপ্রবণ খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদ ঘিরে অবৈধ বালি উত্তোলনকে কেন্দ্র করে এবার প্রকাশ্যে এসেছে রাজনৈতিক যোগসাজশের অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, জামায়াত, বিএনপি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তিন প্রভাবশালী নেতা মিলেমিশে একটি সিন্ডিকেট গড়ে দীর্ঘদিন ধরে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজার বসিয়ে বালি উত্তোলন করছেন। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ও স্থানীয়দের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে রাতের আঁধারে কার্গো ও ইঞ্জিনচালিত নৌযানে বালি তুলে ভোরের আগে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে তীব্র ভাঙন-আতঙ্কে দিন কাটছে শ্যামনগর ও আশপাশের উপকূলীয় জনপদের বাসিন্দাদের।
অভিযোগে যাদের নাম উঠে এসেছে তারা হলেন জামায়াতের যুব বিভাগের গাবুরা ইউনিয়ন সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত, যুবদলের শ্যামনগর উপজেলা শাখার সদস্যসচিব আনোয়ারুল ইসলাম আঙ্গুর এবং সাবেক সংসদ সদস্য জগলুল হায়দারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত যুবলীগের পৃষ্ঠপোষক আব্দুর রহমান বাবু। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই তিনজনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা চক্র নদীর বাঁক ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি ড্রেজার বসিয়ে বালি তুলছে, যা ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের বদ্যিবাড়ি এলাকার আকরাম হোসেন বলেন, ‘রাত নামলেই চার-পাঁচটি কার্গো ও ১০-১২টি ইঞ্জিনচালিত বোট একযোগে বালি তোলে। ভোর হওয়ার আগেই তারা নদী ছেড়ে চলে যায়। মাসের পর মাস ধরে এভাবে বালি উত্তোলন চললেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না।’
পদ্মপুকুর ইউনিয়নের গলাটেপা খেয়াঘাট এলাকার বাসিন্দা রনজিৎ মণ্ডল বলেন, ‘প্রতিবছর ভাঙনের মুখে পড়ছেন তারা। বাপ-দাদার ভিটে ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন আবার যেভাবে বালি তোলা হচ্ছে, তাতে নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
পোড়াকাটলা, দুগার্বাটি, কলবাড়ি, গাবুরা, বুড়িগোয়ালীনি, কাশিমাড়ী, আশাশুনির প্রতাপনগরসহ নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার মানুষ একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, সব দলের প্রভাবশালী নেতারা মিলেই বালি উত্তোলন করছেন। বাধা দিতে গেলে হুমকি-ধমকির শিকার হতে হচ্ছে। নদীর ভাঙনপ্রবণ অংশ থেকে ফসলি জমি, চিংড়িঘের ও বসতভিটা ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে বলেও জানান তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভাঙনপ্রবণ হওয়ায় চলতি বাংলা ১৪৩২ সনে এসব এলাকা বালুমহালের বাইরে রাখা হয়। তবে আশাশুনি উপজেলার হিজলদিয়া মৌজার পাঁচ একর জায়গা জনগুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য বালুমহাল ঘোষণা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই সীমিত জায়গার ইজারা নিয়ে ‘গাজী এন্টারপ্রাইজ’ নাম ব্যবহার করে খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষজুড়ে যত্রতত্র ড্রেজার বসানো হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সাবেক এমপি জগলুল হায়দারের ঘনিষ্ঠ আব্দুর রহমান বাবু যুবদল নেতা আনোয়ারুল ইসলাম আঙ্গুরের নামে ইজারা নেন এবং সার্বিক তদারকিতে থাকেন ইয়াসিন আরাফাত।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আব্দুর রহমান বাবু প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন এবং উপকূলীয় এলাকায় বালি উত্তোলনের একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে তোলেন। সে সময় তিনি ‘বালু বাবু’ নামে পরিচিতি পান। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তিনি এখন যুবদল নেতার ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন বলেও স্থানীয়দের দাবি।
পানখালী ও মুন্সীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দারা জানান, আশাশুনির নির্ধারিত বালুমহাল থেকে নওয়াবেঁকী আড়তে বালি আনতে বেশি খরচ পড়ে। বেশি মুনাফার আশায় নদীর বিভিন্ন স্থানে সরাসরি ড্রেজার বসানো হয়েছে। খোশালখালীর চর, বিড়ালাক্ষ্মীর চর, ঘোলার চরসহ বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে নিয়মিত বালি তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ। এতে পদ্মপুকুর, জেলেখালী, খোশালখালী ও আশপাশের এলাকায় ভাঙন-আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ইমরান সরদার জানান, এখন কোনো বালুমহাল নেই। যারা বালি ওঠাচ্ছে, তারা চুরি করে তুলছে। যত্রতত্র বালি উত্তোলনের ফলে প্রকৃতি-পরিবেশসহ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদী। এই প্রবণতা বন্ধ না হলে কোনোক্রমে উপকূল রক্ষাবাঁধ টিকিয়ে রাখা সম্ভব না।
বালি উত্তোলন নিয়ে ইয়াছিন আরাফাতের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, বালুমহলের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে বালি সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রবি ইন্টারন্যাশনাল তার এক পরিচিত বড়ভাইয়ের দাবি করে তিনি বলেন, ‘সাতক্ষীরা-শ্যামনগরের ভেটখালী সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে বালি সরবরাহ করার জন্য নওয়াবেঁকীতে বড়ভাইয়ের (রবি ইন্টারন্যাশনাল নামীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের) সেই বালির গাদাটি আমি দেখাশোনা করি।’
এ বিষয়ে আব্দুর রহমান বাবু বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছাড়ানো হচ্ছে। নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া বালি ওঠানো হয় না।’ তবে কৌশলগত কারণে তারা কয়েকজন একসঙ্গে ব্যবসা করছেন বলে স্বীকার করেন।
যুবদলের শ্যামনগর উপজেলা শাখার সদস্যসচিব অনোয়ারুল ইসলাম আঙ্গুরের ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারে (০১৭১৫-২৯২৬৭৬) কল করলে তা বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
অভিযানে যেতে গড়িমসির বিষয়ে বুড়িগোয়ালীনি নৌ-পুলিশের ওসি অহিদুজ্জামান বলেন, ‘তারা কি আবারও শুরু করছে? কয়দিন থামছিল, ঠিক আছে, এসি ল্যান্ড সাহেবকে একটু জানিয়ে রাখুন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামছুজ্জাহান কনক জানান, অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের খবর পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নৌ-পুলিশকে বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য আবারও নির্দেশনা দেওয়া হবে।