সিলেটের প্রায় সবকটি উপজেলাই ভারতের সীমান্তবর্তী। ভারতের পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে সীমান্তবর্তী নদীগুলো দিয়ে পানি প্রবেশ করে সিলেটে। তবে এই পাহাড়ি ঢলে ভারতের মেঘালয় সীমান্তবর্তী জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট উপজেলা সবার আগে পানি প্লাবিত হয়। বিগত ’২২ ও ’২৪-এর বন্যায়ও এসব এলাকা মানুষজন সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন।
পরিবেশবিদরা মনে করেন, বালু খেকোদের আগ্রাসনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং নাব্য কমিয়ে দেয়, ফলে অল্প বৃষ্টিতেই নদীতীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়। এসব এলাকা থেকে অপরিকল্পিত বালু, পাথর উত্তোলনের কারণে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হয় এবং পানিবন্দি মানুষজনকে উদ্ধার করতেও প্রচুর বেগ পেতে হয়।
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার একটি অন্যতম প্রধান নদী বড়গাঙ। আঁকাবাঁকা নদীটির আশপাশে আছে পাহাড়ি টিলা ও চা-বাগান। প্রায় ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য, ৬৬ মিটার গড় প্রস্থের এই নদীতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অবৈধ ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন। ফলে নদীটির পরিবেশ ও তীরবর্তী ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়েছে। ভারতের পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে দ্রুত প্লাবিত হয় এই নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ।
৮ কিলোমিটার নদীর বেশির ভাগ জায়গায় অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হচ্ছে। এই বালু উত্তোলনের চিত্র দেখা যায় জৈন্তাপুর উপজেলায় প্রবেশ পথেই। বালু উত্তোলনকারীদের সিন্ডিকেটও অনেক বড়। সব জায়গায় নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী ও পাহারাদার রাখেন তারা। ফলে প্রশাসন অভিযানে গেলে তারা গা-ঢাকা দেন, আক্রমণ করেন। বালু উত্তোলন নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষে জড়ান। গত ৭ মার্চ প্রতিবেদক সরেজমিনে গেলে ছবি, ভিডিও করতে নিষেধ করে বালু উত্তোলনকারীরা। এ সময় দেখা যায়, বড়গাঙ নদীর দুই পাশে ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ৫ শতাধিক নৌকা দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
বালু উত্তোলন রুখতে মাঝেমধ্যে প্রশাসন থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। তবে সরকারের সব সংস্থাসহ সাধারণ মানুষের সমন্বয় না থাকায় এর স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না বলে মনে করেন জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, ‘গত বুধবার আমরা আটজনকে বড়গাঙ নদী থেকে নিয়ে এসেছি। এর আগেও জরিমানা করা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে যাদের পাওয়া যায় তাদের শাস্তি দেওয়া হয়। কিন্তু অবৈধ বালু উত্তোলনের পেছনে যারা আছে তাদের সরাসরি স্পটে না পেলে বা তারা স্বীকার না করলে আমরা শাস্তি দিতে পারি না। আমরা তাদের নাম পুলিশের কাছে দিয়েছি। কিন্তু পুলিশ নিজে থেকে কিছুই করে না।’
ইউএনও বলেন, ‘লিজ থাকলেও বড়গাঙ নদীর ওপর ব্রিজের ৫০০ মিটারের ভেতরে যেন কেউ বালু তুলতে না পারে, ডাম্পিং না করে–তাদের ডেকে আমি বলে দিয়েছি। ডাম্পিং করার জন্য সরাসরি কোনো নির্দেশনা নেই। তবে মন্ত্রী ও ডিসি বলেছিলেন, ৫০০ মিটারের ভেতরে ডাম্পিংও করা যাবে না। তাই এই নির্দেশনা অবশ্যই অমান্য করা যাবে না।’
এ ব্যাপারে সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার আবদুল করিম কিম বলেন, ‘নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলা হলে নদী তীরবর্তী কৃষিজমি, রাস্তাঘাট, স্থাপনা ভাঙনের মুখে পড়ে। একজন দরিদ্র কৃষক সর্বস্ব হারায় বালুখেকোদের সর্বগ্রাসী লোভের কারণে। সবচেয়ে বড় কথা নদী তার প্রবাহের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলে।’
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় সংগঠক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, ‘বালু, পাথরসহ বিভিন্ন খনিজসম্পদ আমাদের জন্য আশীর্বাদ। আমাদের অবকাঠামো উন্নয়ন ও নগরায়ণ তথা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এসব বালু পাথর গুরুত্বপূর্ণ। তবে তা যেন হয় পরিকল্পিত উপায়ে, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ না করে হয়। অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন করলে নদীর স্বাভাবিক গঠন ও প্রবাহের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
এতে নদীর তলদেশে গভীর খাদের সৃষ্টি হয়। নদীর তলদেশ অসমান হয়। এসব খাদ ও গর্তে পানি জমে দ্রুত উপচে পড়ে। এতে বন্যাসহ পুরো এলাকা প্লাবিত হওয়ার অভিজ্ঞতা সিলেট এলাকার রয়েছে।’