‘আমরা প্রকৃতি উপভোগ করতে এসেছি। কিন্তু অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে সেই অনুভূতিটা ঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। বনের ভেতরে গাড়ির চাপ আর হর্নের শব্দ কমানো জরুরি, না হলে বন্যপ্রাণীর জন্য এটা ক্ষতিকর হবে।’
গত রবিবার মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সামনে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রাম থেকে ঘুরতে আসা নাহিদুল ইসলাম।
পাশে দাঁড়ানো আরেক পর্যটক সিলেট থেকে পরিবার নিয়ে আসা শর্মী আক্তার জানান, এখানকার উচ্চ শব্দ ও হইচই পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তুলেছে। আগের মতো নিরিবিলি পরিবেশ এখন আর নেই, যা হতাশাজনক।’
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় নানা প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল হিসেবে এটি দেশ-বিদেশের প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে এই আকর্ষণই এখন বনের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই পর্যটকের ভিড় থাকলেও ছুটির দিনগুলোতে তা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এতে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল ও জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লাউয়াছড়ার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পর্যটকদের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মকানুন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না হলে এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের স্বাভাবিক বৈচিত্র্য হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
ট্যুর গাইড ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২১ থেকে ২৩ মার্চ এই তিন দিনে উদ্যানে পর্যটকের ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বেশির ভাগ পর্যটকই ছোট-বড় দলে এসে বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া ঢাকা-সিলেট রেললাইন ও বিভিন্ন স্পটে জটলা করে উচ্চ শব্দে হইচই করেন, যা পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, টানা ছুটিতে যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করতে মানুষ সবুজের খোঁজে ছুটে আসেন লাউয়াছড়ায়। কিন্তু পর্যটকদের অতিরিক্ত উপস্থিতি ও অসচেতন আচরণে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ (ভানুগাছ) সড়কে যানবাহনের চাপও বাড়ছে। গাড়ির শব্দ, হর্ন ও মানুষের কোলাহলে প্রাণীদের স্বাভাবিক নীরবতা ভেঙে যায়, তারা আড়ালে সরে যেতে বাধ্য হয়।
তাদের ভাষ্য, লাউয়াছড়া মূলত বন্যপ্রাণী ও বন সংরক্ষণের জন্য। বন, বন্যপ্রাণী না থাকলে একসময় এখানে কেউ আসবে না। পর্যটকদের গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান নেই। বনের ভেতর দিয়ে সড়ক গেছে, এই সড়কে যানবাহনের ২০ কিলোমিটার গতি নির্ধারণ করা আছে। কিন্তু এটা কেউ মানতে চায় না।
এদিকে লাউয়াছড়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরেও কোনো প্রাণীর দেখা মেলেনি বলে জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন পর্যটক।
গত শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত লাউয়াছড়ায় ৪ হাজার ৭৪২ জন পর্যটক প্রবেশ করেছেন এবং ৫ লক্ষাধিক টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে বলে জানিয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সহব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয়।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্যমতে, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের আয়তন ১ হাজার ২৫০ হেক্টর। সরকার ১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়াকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। উদ্যানটি ১৬৭ প্রজাতির গাছ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৫৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ২২ প্রজাতির উভচরসহ অসংখ্য বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও উদ্ধারের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিউর সমন্বয়ক সোহেল শ্যাম বলেন, ‘লাউয়াছড়া আসলে বন্যপ্রাণীর জায়গা। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে এই বন তার স্বকীয়তা হারাবে। এখনই সচেতন না হলে লাউয়াছড়া কেবল নামেই সংরক্ষিত বন হয়ে থাকবে, বাস্তবে নয়।’
জেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সৈয়দ মহসিন পারভেজ বলেন, ‘এই বন মূলত বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ এদের স্বাভাবিক আচরণে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত ভিড় ও শব্দদূষণ প্রাণীদের জন্য বড় ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, পর্যটন অবশ্যই দরকার, তবে তা হতে হবে নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব। লাউয়াছড়ার জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে এখনই কঠোরভাবে নিয়ম বাস্তবায়ন এবং পর্যটকদের সচেতন করা জরুরি। প্রাণী না থাকলে এই বন তার আকর্ষণ হারাবে। তাই সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।