রাজশাহী বিভাগে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ল্যাব পরীক্ষায় ৭৭ জনের শরীরে হামের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের অধিকাংশই ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশু, যাদের বেশির ভাগই টিকাবঞ্চিত।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত বিভাগজুড়ে মোট ৩৪২ জন হামে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হয়েছে। এর মধ্যে শনাক্তের হার ২২ দশমিক ৫১ শতাংশ। সংক্রমণের শীর্ষে রয়েছে পাবনা জেলা, যেখানে ৩৩ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সেখানে শনাক্ত হয়েছে ২০ জন। এ ছাড়া রাজশাহীতে ১০ জন, নাটোরে ৬ জন, নওগাঁয় ৫ জন এবং বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় একজন করে আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। জয়পুরহাটে এখন পর্যন্ত কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি।
এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া তিনজনের মধ্যে দুজন পাবনা জেলার এবং একজন রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ১২৬ রোগী চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৭০ জন। পাশাপাশি হামের পাশাপাশি রুবেলায় আক্রান্ত দুজন রোগীও শনাক্ত হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সেখানে হামের সন্দেহভাজন ২৩০ জন রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭৩ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের ফলাফল পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ২৮ জনের রিপোর্ট পজিটিভ।
রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম জানান, জেলায় ১০ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো শিশুর মৃত্যুর তথ্য তার কাছে নেই। তিনি বলেন, ‘যেসব শিশু আক্রান্ত হচ্ছে তাদের বয়স সাধারণত ৬ থেকে ৯ মাস। অথচ হামের টিকা দেওয়া হয় ১০ থেকে ১৫ মাস বয়সে। ফলে এ বয়সী শিশুরা টিকার আওতার বাইরে থাকায় ঝুঁকিতে রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, হাম ও রুবেলা ভাইরাসজনিত রোগ, যা অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়। এ কারণে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে আলাদা রাখা এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধানী দলকে সক্রিয় করা হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কাছে পর্যাপ্ত হামের টিকা রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যারা এখনো টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত আওতায় আনা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করণীয় নির্ধারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। তাদের সহযোগিতায় দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।’
এদিকে সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগে রোগীর চাপ চরমে পৌঁছেছে। ২০০ শয্যার বিপরীতে প্রায় এক হাজার শিশু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি বেডে তিন-চারটি শিশুকে রাখা হচ্ছে, আবার অনেকে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে। এতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হাসপাতালে শিশুদের জন্য আইসিইউ বেড রয়েছে মাত্র ১২টি। প্রয়োজনের তুলনায় এ সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, আইসিইউ পেতে প্রায় ২০ থেকে ২৫ রোগীর সিরিয়াল রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষারত অবস্থায়ই রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।
আইসিইউ বিভাগের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের মতে, একটি বেড খালি না হওয়া পর্যন্ত নতুন রোগী নেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে জটিল রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। রাজশাহী বিভাগের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকেও জটিল রোগীদের এখানে পাঠানো হয়, যা চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইসিইউ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এক মায়ের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, আইসিইউ বেড না পেয়ে অনেক পরিবার হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নিউমোনিয়া ও হাম আক্রান্ত শিশুদের ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে। জটিলতা বাড়লে এসব রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন হয়, কিন্তু বেডসংকটের কারণে তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ রোগী ভর্তি হয় এবং চিকিৎসাধীন থাকে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার। শিশু বিভাগে প্রতি সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৪০ জন শিশুর মৃত্যু হয়। আইসিইউ বেডের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম, যা বড় চ্যালেঞ্জ।’ অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেক পরিবার বিপাকে পড়ছে।
রাজশাহীর বনগ্রামের বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন জানান, তার ভাতিজাকে আইসিইউ না পেয়ে বেসরকারি হাসপাতালে নিতে হয়, যেখানে প্রতিদিন ৮-৯ হাজার টাকা খরচ হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।
স্থানীয় নাগরিক সংগঠন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ‘উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু আইসিইউ-সংকটের কারণে অনেকেই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রুত বেডসংখ্যা বাড়ানো ও নির্মিত শিশু হাসপাতাল চালু করা জরুরি।’