শেরপুরে জ্বালানি তেলের তীব্রসংকট দেখা দিয়েছে। জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে ‘পেট্রল ও অকটেন নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, পাম্প কর্তৃপক্ষ বোতলে তেল বিক্রি করে কৃত্রিমসংকট তৈরি করছে। তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও জ্বালানি না পেয়ে চালকরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
জানা গেছে, জেলা শহরসহ শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও নকলা উপজেলায় মোট ১৫টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭টিতে পেট্রল, অকটেন এমনকি ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না। বাকি স্টেশনগুলোতে ২-৩ দিন পর পর অল্প পরিমাণে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। আর একটি স্টেশনেই শুধু কিছুটা নিয়মিত অকটেন পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলায় সব স্টেশনেই তেলের সরবরাহ সীমিত। মোটরসাইকেলে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না, যা দৈনন্দিন প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। ফলে চালকদের বারবার পাম্পে যেতে হচ্ছে। অনেকেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছেন না।
চালকদের অভিযোগ, কিছু পাম্পে সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করে বোতলে করে পাঁচ থেকে ১০ লিটার পর্যন্ত তেল বিক্রি করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সাধারণ গ্রাহক বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে কৃত্রিমসংকট আরও বাড়ছে। তারা বলছেন, সরবরাহ কম থাকলেও সঠিক বণ্টন না হওয়াই মূল সমস্যা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ লাইন। মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি। অনেক চালক এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরছেন। কোথাও কোথাও তেল না থাকলেও অনেকে পাওয়ার আশায় দাঁড়িয়ে থাকছেন।
শহরের খোয়ারপাড় এলাকার হক ফিলিং স্টেশনে দুই দিনে একাধিকবার এসেও তেল না পেয়ে হতাশ মিজানুর রহমান। শ্রীবরদী উপজেলার নয়ানী শ্রীবরদী এলাকার এই বাসিন্দা বলেন, ‘সরকার বলছে তেল আছে, কিন্তু আমরা পাচ্ছি না। লাইনে মোটরসাইকেল রেখে সামনে এসে দেখি বোতলে তেল দেওয়া হচ্ছে। তাহলে আমরা কী দোষ করেছি? চোখের সামনেই কেউ কেউ ২-৩ বার করে তেল নিয়ে যাচ্ছে।’
সদরের পাঞ্জরভাঙা এলাকার গোলাপ মিয়া বলেন, ‘৩-৪ দিন ঘুরে আজ তেল পেয়েছি। পাম্পে সিন্ডিকেট আছে। যার ক্ষমতা আছে, সে-ই তেল পায়।’ মোটরসাইকেল চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই মুহূর্তে বোতলে কেন তেল দিতে হবে। আমরা গাড়ি নিয়ে তেল পাচ্ছি না। অথচ বোতলে সহজেই দেওয়া হচ্ছে। এটা অন্যায়।’
প্রাইভেট কার চালক শামীম আহমেদ বলেন, ‘যে পরিমাণ তেল দিচ্ছে তা দিয়ে পুরোদিন চলা সম্ভব হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সরবরাহের চেয়ে বিতরণে বেশি সমস্যা হচ্ছে। যদি ঠিকভাবে তদারকি হতো, তাহলে এমন অবস্থা হতো না।’
অভিযোগের বিষয়ে খোয়ারপাড় হক ফিলিং স্টেশনের দায়িত্বে থাকা বুলবুল আহম্মেদ বলেন, ‘তেল আসার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়ছে। তেল শেষ হলেও চালকরা পাম্প থেকে যাচ্ছে না। যত লিটার তেল পাই, ততটুকু নিয়মমাফিক চালকদের মাঝে বিক্রি করছি। এখানে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। আমরা সতর্ক থেকে তেলগুলো বিক্রি করছি। এমনকি সুপারিশ থাকলেও নিয়ম ছাড়া তেল দিচ্ছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বোতল কিংবা কোনো পাত্রে তেল দিচ্ছি না। কেউ যদি খুব বিপদে পড়ে যান, তাহলে তাদের বিস্তারিত জেনে তেল দিচ্ছি। তাছাড়া মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারে নিয়ম অনুযায়ী তেল বিতরণ করা হচ্ছে।’
গৌরীপুর এলাকার মমিনবাগ সার্ভিস স্টেশনের ম্যানেজার বেলাল মিয়া বলেন, ‘আগের চেয়ে বেশি তেল আনলেও চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল নিচ্ছেন। তেল শেষ হলে পাম্প বন্ধ করতে গেলে কর্মীদের গালমন্দ ও হুমকির মুখে পড়তে হয়।’
জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘প্রতিটি পাম্পে একজন করে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশৃঙ্খলা এড়াতে প্রায় সব পাম্পেই পুলিশ সদস্যরা কাজ করছেন। এ ছাড়া পাম্পগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। কোথাও অনিয়মের তথ্য পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’