রাজধানীর মগবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে সন্তানসহ স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় রহস্যের জট খোলেনি। তাদের মৃত্যু নিয়ে পরিবার-স্বজন ও সাধারণ মানুষের মনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। মৃত মনির হোসেনের বাড়ির কেয়ারটেকার রফিকুল ইসলামকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছে পুলিশ। কেননা, রফিকুলই ওই হোটেল ভাড়া ও বাইরে থেকে খাবার কিনে এনে দেন।
স্বজন ও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মনির হোসেনের ঢাকার পোস্তগোলায় পাঁচতলা বাড়ি আছে। এ ছাড়া একাধিক ফ্ল্যাটসহ ব্যবসায় বেশকিছু টাকা বিনিয়োগ ছিল। এগুলো দেখাশোনা করতেন কেয়ারটেকার রফিকুল ইসলাম। তবে খাবারের বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে কি না সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কিছু বলতে পারছে না পুলিশ।
এ বিষয়ে রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম ফারুক গতকাল সোমবার দুপুরে খবরের কাগজকে বলেন, ‘খাবারের বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে এমন শোনা গেলেও এই দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। কারণ একই খাবার আরও অনেকে খেয়েও তারা সুস্থ আছেন। ফলে মৃত ব্যক্তিদের ভিসেরা পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর বাইরেও খুবই মর্মান্তিক এই মৃত্যুর নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ ও রহস্য আছে কি না সেটিও উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। এই ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলমান আছে বলেও জানান তিনি।’
এদিকে গতকাল দুপুরে ওই তিনজনের ময়নাতদন্তের আলামত সংরক্ষণ সংক্রান্ত তদন্ত করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. জাকিয়া তাসনিম। এ বিষয়ে তিনি জানান, পুলিশের সুরতহালে উল্লেখ হয়েছে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লাশের ‘সিম্পটম’ দেখে আমাদেরও সেটাই মনে হয়েছে। ভিসেরা পরীক্ষার জন্য লাশগুলো থেকে বিভিন্ন ধরনের আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। সেটা অ্যানালাইসিসের জন্য মহাখালীর রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে। ওই প্রতিবেদন পেলেই মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।
স্বজনরা জানান, মনির হোসেন-স্বপ্না আক্তার দম্পতি তিন ছেলের জনক-জননী ছিলেন। ঢাকায় বাড়ি থাকলেও লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের দেহলা গ্রামের বাড়িতে থাকতেন তারা। মনির হোসেনের ঢাকার বাড়িসহ যাবতীয় বিষয় দেখাশোনা করতেন তার কেয়ারটেকার রফিকুল ইসলাম। শনিবার অসুস্থ ছেলে নাঈম হোসেনের চিকিৎসার জন্য তাকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন সৌদিপ্রবাসী মনির হোসেন ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। মগবাজারের আবাসিক ‘হোটেল সুইট স্লীপে’ উঠেছিলেন তারা, যা ভাড়া করে দেন রফিকুল। রফিকুলের মাধ্যমে শনিবার রাতে পাশের ‘ভর্তা ভাত’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার এনে খান তারা। রাতেই তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর রবিবার সকালে তাদের পাশের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু তিনজনের কাউকেই বাঁচানো যায়নি। মৃত ছেলে নাঈম সবার ছোট। এই ঘটনায় স্বজন ও প্রতিবেশীসহ পরিচিতদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।
সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরিকারী রমনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. জালাল উদ্দিন জানান, তিনজনের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় তিনটি লাশের শরীরের কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে তাদের মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।
মনিরের চাচাতো ভাই জাকির হোসেন মুঠোফোনে খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রকাশ্য তাদের কোনো শত্রু ছিল না। কোনো বিষয় নিয়ে কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব নাই। ছেলের চিকিৎসার জন্য তারা ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকার পোস্তগোলায় মনিরের একটি পাঁচতলা বাড়ির দেখভাল করেন রফিকুল ইসলাম। রফিকুলের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে মগবাজারের ওই হোটেল ভাড়া করেছিলেন।’
তিনি অভিযোগ করেন, খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে তাদের হত্যা করা হয়েছে। কে বা কারা জড়িত, কেন এটা করা হয়েছে তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে হোটেল সুইট স্লীপের সহকারী ব্যবস্থাপক আনোয়ারুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা গেছে, সন্ধ্যায় একটি ব্যাগে করে খাবার নিয়ে আসেন রফিকুল। পরে তিনি চলে যান। রাত আটটার দিকে মনির নিচে নেমে পানি নিয়ে ওপরে উঠেন। পরে রাতে তারা অসুস্থ হলেও হোটেলের কাউকে কিছু জানাননি। পরে রবিবার বেলা ১১টার দিকে রফিকুল তার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে হোটেলে আসেন। তিনি প্রথমে স্বপ্না, তার প্রায় আধা ঘণ্টা পরে মনিরকে একই হাসপাতালে নিয়ে যান। কক্ষে রফিকুলের মেয়ের চিৎকার শুনে হোটেলের কর্মচারীরা অচেতন অবস্থায় এই দম্পতির ছেলে নাঈমকেও হাসপাতালে নিয়ে যান বলে জানান তিনি।