মুড়িকাটা পেঁয়াজ এখন বাজারে। তারপরও হুহু করে বাড়ছে দাম। গত তিন দিনে (প্রতিদিন ২০ টাকা করে বেড়ে) পেঁয়াজের দাম ১৬০ টাকায় ঠেকেছে। ঢাকার বাইরেও দাম বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, সিন্ডিকেট করে মোকাম থেকেই বাড়ানো হচ্ছে দাম। কারণ এখনো ফড়িয়াদের ঘরে পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৫ লাখ টন। উৎপাদন হয় এর দেড় গুণেরও বেশি। প্রক্রিয়াজাতকরণে ক্ষতি হয় ২৫ শতাংশ। আমদানিও হয় ৬ লাখ টনের মতো। তারপরও শেষ সময়ে পেঁয়াজের এ অবস্থা। আড়তদাররা বলছেন, পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিলেই কমবে দাম। লাগাম টানতে বাধ্য হয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি (আইপি) দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীদের পর্যায়ক্রমে দেড় হাজার টন করে আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে।
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গত মাস থেকেই পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। গত অক্টোবর মাসেও ঢাকার বিভিন্ন বাজারে খুচরা পর্যায়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। নভেম্বরের শুরুতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয় পেঁয়াজ। মাসজুড়ে এই উচ্চমূল্যেই ছিল দাম। গত বুধবারও দাম মানভেদে দাম ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকা। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ দাম বেড়ে ১৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি শুরু হয়। গত শুক্রবার তা বেড়ে হয় ১৫০ টাকা, গতকাল পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হয়েছে ১৬০ টাকায়।
মোহাম্মপুরের টাউন হল বাজারের মো. রফিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে পাইকারি বাজারে প্রতিদিন দাম বাড়ছে ২০ টাকা করে। আজ (শনিবার) ১৬০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। কারণ ১৪৮ টাকা কেজি দরে আমরাই কিনেছি পাইকারি বাজার থেকে।
পরিবহনসহ অন্য খরচ আছে। বস্তায় কিছু বাদও যায়। সামান্য মুনাফা রেখে বিক্রি করলেও দাম ১৬০ টাকা রাখতে হয়।’ কারওয়ান বাজারের মো. সুমনসহ অন্য বাজারের খুচরা বিক্রেতারাও জানান, মোকাম থেকে সিন্ডিকেট করেই পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হচ্ছে। বেশি দামে বিক্রি করলেও লাভ আগের মতো হয় না।
তাদের কথার সত্যতা যাচাই করতে শ্যামবাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ত বণিক সমিতির সহসভাপতি মো. মাজেদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘মোকাম থেকেই পেঁয়াজের দাম বেঁধে দেন ব্যাপারীরা। সেই দামে বিক্রি করতে হয়। তারা সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। অর্ধেকও সরবরাহ করা হচ্ছে না। তাই দাম বাড়া অব্যাহত আছে। আমদানির অনুমতি দিলেই কমে যাবে দাম। গতকাল পাইকারি পর্যায়ে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। শুক্রবার ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায় বিক্রি হয়। তিন দিন ধরে বাড়ছে দাম। সরকার কী করলে কমবে দাম? এমন প্রশ্নের জবাবে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, সরকারকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি (আইপি) দিতে হবে। আমদানি করা পেঁয়াজ আসলে দাম ৫০ টাকায় নেমে আসবে। অন্য বছরও দেখা গেছে, পেঁয়াজ আমদানির ঘোষণা দিলেই দেশে দাম কমে যায়।
কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা কৃষকের ক্ষতি চাই না। পেঁয়াজের দাম বাড়ার ব্যাপারে আমরা এক মাস ধরে পর্যবেক্ষণ করছি। কৃষকের কথা বিবেচনা করে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু হঠাৎ করে দাম বাড়তে থাকায় বাণিজ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মিটিং করে সীমিত আকারে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনেক আবেদন জমা হয়েছে। দিনে দেড় হাজার টন করে আমদানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। কয়েক দিন দেখব। দাম স্থিতিশীল হলে আমদানি বন্ধ করা হবে।’
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সূত্র বলছে, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৫ লাখ টনের মতো। রোজায় চাহিদা বাড়ে। সেই এক মাসেই লাগে প্রায় ৫ লাখ টন। কয়েক বছর ধরে গড়ে কম-বেশি ৩৭ লাখ টনের মতো পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। তরে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ জটিলতায় ২৫ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়। তারপরও ৬ লাখ টনের মতো আমদানি করা হয়। কাজেই দেশে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি থাকে না। তারপরও হালি পেঁয়াজের শেষ সময়ে দাম বেড়ে যায়। গত বছরও এ সময়ে খুচরায় দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা হয়। পেঁয়াজ আমদানিতে ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক (সিডি) ও ৫ শতাংশ শুল্ক থাকায় সরকার বাধ্য হয়ে ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বর আমদানির ওপর থেকে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে।
এখনো পাবনা, ফরিদপুর কুষ্টিয়ায় পেঁয়াজ মজুত আছে
দেশের বেশির ভাগ পেঁয়াজ সরবরাহ হয় পাবনা, ফরিদপুর এবং কুষ্টিয়া জেলা থেকে। সেখানে ধনী কৃষকদের পাশাপাশি অনেক ফড়িয়া এবং বড় ব্যবসায়ীর কাছে মজুত রয়েছে হাজার হাজার টন পেঁয়াজ। সেই পেঁয়াজ কিনতে দেশের পাইকারি বাজারের ক্রেতারা এই তিন জেলার মোকামগুলোতে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন। খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস খবরের কাগজকে বলেন, সপ্তাহখানেক আগে পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমতির দিকে ছিল। এরপর এক লাফে কেজিতে বাড়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। বর্তমানে পুরোনো দেশি পেঁয়াজ মানভেদে কেজিপ্রতি ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছয় মাস ধরে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ। সরকার আমদানির অনুমতি দিলে দাম ৬০ টাকায় চলে আসত।’
চট্টগ্রাম শহরের শুলকবহর এলাকার কাশফিয়া নামক মুদি দোকানের স্বত্বাধিকারী আজিজুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘পেঁয়াজের বাজার স্থির না হওয়া পর্যন্ত আর বিক্রি করব না। এক বস্তা পেঁয়াজ বিক্রি করার জন্য আনলে তা থেকে কয়েক কেজি পচে যায়। দুই দিন না যেতেই দেখা যায়, হয় দাম কমেছে, না হয় বেড়েছে। দাম কমলে আমরা বিপদে পড়ি। কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হই। সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে পেঁয়াজের বাজার। আর আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাতে পড়েন মহাবিপাকে।’
কুষ্টিয়ায় দাম বাড়ার কারণ
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার জিয়ারখি গ্রামের পেঁয়াজচাষি রতন গত মৌসুমে তিন বিঘা জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করে পান প্রায় ১০০ মণ পেঁয়াজ। তিনি প্রথমে ৭০ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে দেন। ৩০ মণ পেঁয়াজ এখনো মাচায় মজুত রেখেছেন। কুষ্টিয়া সদর, দৌলতপুর, কুমারখালীতে রতনের মতো শত শত চাষি এবং মৌসুমি ফড়িয়া ব্যবসায়ীরাও পেঁয়াজ মজুত করে রেখেছেন। বাজারে পেঁয়াজ না ছাড়ায় অস্থির হয়েছে দেশের পেঁয়াজের বাজার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি না থাকায় মৌসুমি ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা এখন বেপরোয়া। পাবনা, ফরিদপুরেও একই কায়দায় পেঁয়াজ মজুত করে বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। ফরিদপুরে গতকাল শনিবার ১৩০ টাকা থেকে ১৪০ টাকায় পাইকারি বাজারে বিক্রি করা হয়েছে পেঁয়াজ।
দিনাজপুরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে দাম
দিনাজপুরেও বেড়েছে দেশি পেঁয়াজের দাম। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। ক্রেতারা বলছেন, বাজারে পেঁয়াজের সংকট নেই।
দিনাজপুরের বাহাদুর বাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী আরিফ, মো. শামীম ও রাব্বিকুল ইসলাম বলেন, দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ হঠাৎ কমে গেছে। মৌসুম শেষ, নতুন পেঁয়াজ আসতে দেরি হচ্ছে। এ জন্য দাম প্রতি কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। পাইকারি বাজারেই দাম চড়া। আমরা চাইলেও কম দামে দিতে পারছি না। আমাদের দিক থেকে কোনো সিন্ডিকেট নাই। আমদানি বন্ধ থাকায় এ অবস্থা পেঁয়াজের।
[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন কুষ্টিয়া প্রতিনিধি মিলন উল্লাহ ও দিনাজপুর সুলতান মাহমুদ]