মাগুরার শালিখা উপজেলার ধনেশ্বরগাতী ইউনিয়নের পিপরুল গ্রামের কৃষক জামাল মণ্ডল বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ করে এলাকায় নতুন সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। একসময় বিদেশে কর্মরত থাকলেও দেশে ফিরে কৃষিকেই জীবিকার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন তিনি। বর্তমানে মাত্র ২০ শতক জমিতে গড়ে তোলা তার আঙুর বাগান থেকে প্রতিবছর লাখ টাকা আয় হচ্ছে, যা স্থানীয় কৃষকদেরও আঙুর চাষে উৎসাহিত করছে।
জানা গেছে, প্রায় চার বছর বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরে কৃষিকাজে মনোযোগ দেন জামাল মণ্ডল। চার বছর আগে যশোরের খাজুরা লেবুতলা এলাকায় তার বড় ভাইয়ের আঙুর বাগান দেখে অনুপ্রাণিত হন তিনি। ভাইয়ের সফলতা তাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। পরে ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু আঙুরের চারা সংগ্রহ করে নিজের জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন। শুরু থেকেই স্ত্রী সাবিনা খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে বাগানের পরিচর্যা করতে থাকেন তিনি।
প্রথম বছরেই আশাতীত সাফল্য পান জামাল। বাগান থেকে উৎপাদিত আঙুর বিক্রি করে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা আয় করেন। এতে তার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ভারত থেকে উন্নত জাতের কিছু চারা সংগ্রহ করে বাগানের পরিধি বাড়ান। দ্বিতীয় বছর আঙুর বিক্রি করে দুই লাখ টাকার বেশি আয় করেন তিনি।
তবে চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ফলন কিছুটা কম হয়েছে। তার পরও এক থেকে দেড় লাখ টাকার আঙুর বিক্রির আশা করছেন এই উদ্যোক্তা কৃষক।
বর্তমানে জামাল মণ্ডলের বাগানে লাল চয়ন, বাইক্লো, জিএস থ্রি ও জাম্বুরা জাতের প্রায় ৬০টি আঙুরগাছ রয়েছে। বাগানে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে লতানো গাছে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা রসালো আঙুর। পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জামাল ও তার স্ত্রী। নিয়মিত সেচ, সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গাছগুলোকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এলাকায় অনেকেই বাড়ির আঙিনায় শখের বসে আঙুরগাছ লাগিয়ে থাকেন। কিন্তু ফল টক হওয়া কিংবা বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে খুব কম মানুষই বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষে এগিয়ে আসেন। সেই জায়গায় জামাল মণ্ডল সফলভাবে আঙুর উৎপাদন করে বাজারে ভালো দাম পাচ্ছেন।
জামাল মণ্ডল বলেন, ‘আমার ভাই যশোরের খাজুরা লেবুতলায় আঙুরসহ বিভিন্ন ফলের চাষ করেন। তার সাফল্য দেখে আমারও আগ্রহ তৈরি হয়। পরে তার কাছ এবং ভারত থেকে চারা সংগ্রহ করে বাগান গড়ে তুলি। বর্তমানে প্রতিটি গাছে গড়ে প্রায় ২০ কেজি পর্যন্ত আঙুর উৎপাদন হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দামে বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম মৌসুমে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার আঙুর বিক্রি করেছি। দ্বিতীয় বছরে দুই লাখ টাকার বেশি বিক্রি হয়েছে। এ বছর আবহাওয়ার কারণে ফলন কিছুটা কম হলেও এক লাখ টাকার বেশি আয় হবে বলে আশা করছি। ভবিষ্যতে বাগানের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’
নিজের সাফল্যের পাশাপাশি এলাকার অন্য কৃষকদেরও আঙুর চাষে উৎসাহিত করছেন জামাল। তিনি জানান, গত বছর প্রায় ১ হাজার আঙুরের চারা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করেছেন। কেউ আঙুর চাষে আগ্রহ দেখালে তিনি পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে থাকেন।
জামালের স্ত্রী সাবিনা খাতুন বলেন, ‘আমরা দুজনে মিলে দিনের বেশির ভাগ সময় বাগানে কাজ করি। গাছের পরিচর্যা থেকে শুরু করে সব ধরনের কাজ একসঙ্গে করি। আমাদের ইচ্ছা ভবিষ্যতে বাগান আরও বড় করা এবং আঙুর চাষকে লাভজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।’
এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ তাজুল ইসলাম জানান, জামাল মণ্ডলের আঙুর বাগান নিয়মিত কৃষি বিভাগের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘জামাল মণ্ডলের সফলতা দেখে অনেক কৃষক আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এ ধরনের উদ্যোগ কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে এবং কৃষকদের বিকল্প আয়ের পথ খুলে দেবে।’